মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন একজন কাল সচেতন ও ইতিহাস সচেতন কবি। আধুনিক কাব্য কলার বিচিত্র ইজম প্রয়োগ ও শব্দ নিরিক্ষের ক্ষেত্রেও তার অনন্যতা বিস্ময়কর। বিশেষত: কবিতার উপমা প্রয়োগে জীবনানন্দের নৈপূণ্য তুলনাহীন। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ন করে গদ্যের স্পন্দন যুক্ত করেন, যা পরবর্তী কবিদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। জীবন বোধকে নাড়া দিয়েছে।
কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রূয়ারী বরিশালে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন স্কুল শিক্ষক ও সমাজ সেবক। “তিনি ব্রহ্মবাদী” পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মাতা কুসুম কুমারী ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। জীবনানন্দ দাশের বাল্য শিক্ষার সুত্রপাত হয় মায়ের কাছেই। তার পর তিনি বরিশালের ব্রজমোহন স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

 

১৯১৭ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই, এ প্রথম বিভাগে এবং ১৯১৯ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজীতে অর্নাস সহ বি, এ পাস করেন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম, এ পাস করেন। ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজী ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। জীবনানন্দ দাস ১৯৩৫ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কিছু আগে তিনি স্বপরিবারে কলকাতায় চলে যান। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ “ঝরাপালক”। ১৯৩০ সালের ৯ মে বিয়ে করেন রোহিনী কুম

ার গুপ্তের মেয়ে লাবণ্য গুপ্তকে। বিবাহিত জীবন তাঁর মোটেই সুখের ছিলনা। জীবনানন্দ দাশ বৈবাহিক জীবনে কখনো সফলতা পান নাই। বার বার ভাবতেন আত্নহত ্যার কথা। ভেবেছিলেন স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে সাগরের জলে ডুবে মরবেন। সারাটা জীবন তিনি পৃথিব ??র শ্রেষ্ঠতম স্থান মনে করতেন আমাদের এই বাংলাদেশকে। জীবনানন্দ দাশ কবি হলেও অসংখ্য ছোট গল্প, কয়েকটি উপন্যাস ও প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি এগুলি প্রকাশ করেন নাই।

তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬ খ্রিঃ) বনলতা সেন (১৯৪২ খ্রিঃ), মহাপৃথিবী (১৯৪৪ খ্রিঃ), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮ খ্রিঃ) রূপসী বাংলা (১৯৫৭ খ্রিঃ), বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১ খ্রিঃ) এছাড়াও বহু অগ্রন্থিত কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মালাবান (১৯৭৩ খ্রিঃ), সুতীর্থ (১৯৭৭ খ্রিঃ), জলপাই হাটি (১৯৮৫ খ্রিঃ) জীবন প্রনালী (অপ্রকাশিত), রাসমতির উপাখ্যান (অপ্রকাশিত) ইত্যাদি।

 

তাঁর রচিত গল্পের সংখ্যা প্রায় দুইশতাধিক। কবিতার কথা (১৯৫৫ খ্রিঃ) নামে তাঁর একটি মননশীল ও নন্দন ভাবনা মূলক প্রবন্ধগ্রন্থ আছে। স¤প্রতি কলকাতা থেকে তাঁর গদ্য রচনা ও অপ্রকাশিত কবিতার সংকলন রূপে “জীবনানন্দ সমগ্র” (১৯৮৫-১৯৯৬ খ্রিঃ) নামে বারো খন্ড রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১ খ্রিঃ) নিবিড় প্রকৃতি চেতনাময় নিঃসর্গ ও রূপকথা- পুরাণের জগৎ তার কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্র রূপময়।

 

বিশেষতঃ “রূপসী বাংলা” কাব্যগ্রন্থে যে ভাবে আবহমান বাংলার চিত্ররূপ ও অনুসুক্ষè সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে তিনি রূপসী বাংলার কবি হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। E 0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6" target="_blank">বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পেক্ষাপটে জীবনানন্দের কবিতার ভুমিকা ঐতিহাসিক। ষাটের দশকে বাঙ্গালির জাতি সত্তা বিকাশের আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংগ্রামী চেতনায় বাঙ্গালি জনতাকে তাঁর “রূপসী বাংলা” গভীরভাব ? অনুপ্রাণিত করে।
জীবনানন্দ ছিলেন আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্ থ “বনলতা সেন” নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে ১৯৫৩ সালে পুরস্কৃত হয়। জীবনানন্দের “শ্রেষ্ঠ কবিতা” গ্রন্থটি ১৯৫৪ সালে ভারত সরকারের সাহিত্য একাদেমী পুরস্কার লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক ট্রাম দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে জীবনানন্দ দাশ অকালে মৃত্যু বরণ করেন। কবি জীবনানন্দের বনলতা সেনের অনুসন্ধান আধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রগন্য। তাঁর কবিতার চিত্রময়তা, যার সঙ্গে আমরা অনায়াসে ঘনিষ্ট বোধ করি। এটি তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম একটি কারণ। যে প্রকৃতির বর্ণনা জীবনানন্দ করেন, বাস্তবে তাকে আমরা আর খুঁজে পাইনা, পাইনা বলেই হয়তো হারানো সেই সৌন্দর্য্যকে আমরা নিজের ভেবে ও প্রবল ভাবে আঁকড়ে ধরি। অনেক সময় তাঁর উচ্চারিত শব্দ চিত্র আমাদের ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে। সম্রাট বিম্বিসার কে, বির্দভ নগর কোথায়, তা’না জেনেই মনে মনে নিজের মতো এক চিত্র ও ধ্বনির জগৎ আমরা গড়ে নেই। আগা গোড়া তার কবিতার সুর বিষন্ন, সবচেয়ে উজ্জ্বল যে রং তাও ধূসর, অথচ তা’ সত্বেও জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আমরা ব্যক্তিগত প্রনোদনার উৎস খুঁজে পাই।


ইতিহাস খ্যাত অর্ধবঙ্গেশ্বরী মহারাণী ভবানীর রাজবাড়ী .bdlst.com/search?keyword=%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%9F%E0%A7%8B%E0%A6%B0 " target="_blank">নাটোর, উত্তরাগনভবন নাটোর, কাঁচা গোল লার শহর নাটোর, কবি জীবনান্দ দাশের বনলতা সেনের বাড়ী নাটোর। বনলতা সেন বলে কোনো নারী কি ইতিহাসে ছিল? নাকি এটি শুধু কবির নিছক কল্পনা। বিখ্যাত বনলতা সেন কবিতায় তিনবার বনলতা সেনের নাম নিয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তার মধ ্যে দু’বার কবি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন বনলতা সেনের আবাস ভূমি বাংলাদেশের নাটোর।

 

কে এই সুন্দরী নারী? কী তার পরিচয়? নাটোরে বনলতা সেন নামের কোনো মায়াবতী মেয়ের সঙ্গে কী জীবনানন্দ দাশের আদৌ পরিচয় ছিল? তার চেয়ে বড় কথা কবি কি কখনো নাটোরে পদার্পন করেছিলেন? বনলতা সেন বইটি হাতে নিয় ? গোপাল চন্দ্র রায় একবার কবিকে জিজ্ঞাসা ও করেছিলেন “দাদা আপনি যে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন, এই বনলতা সেনটা কে? এই নামে সত্যি আপনার পরিচিত কোনো মেয়ে ছিল নাকি?” এতগুলো প্রশ্ন শুনে শুধু মুচকি হেসেছেন কবি কিন্তু কোনো উত্তর দেন নি।

 

বনলতা সেন বিষয়ে আজীবন এই নীরবতা বজায় রেখেছেন কবি, মনের অজান্তেও কখন ও কোনো প্রিয়জনের কাছে বনলতা সেনের কোনো কাহিনী বর্ণনা করেন নি। তবে কবি নীরব থাকলেও গবেষকরা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেন নাই। বনলতা সেনের অন্বেষণে প্রানান্ত চেষ্টা করেছেন কিন্তু বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাননি তারা। এমনকি জীবনানন্দ দাশ কখনো নাটোরে পদার্পণ করেছিলেন কিনা এ ব্যাপারে ও কোনো তথ্য উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছেন গবেষকরা। জীবনান্দ দাশের অন্য লেখায়ও নাটোরে তাঁর আগমন সম্পর্কে অধ্যাবধি কোনো তথ্য পাওয়া যায়না।

 

ফলে গবেষকদের কাছে বনলতা সেন রয়ে

গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে কবি জীবনানন্দের বনলতা সেনের অনুসন্ধান। তবে গবেষকরা বনলতা সেন কে রহস্যময়ী মানবী হিসেবে চিত্রিত করলে কী হবে, নাটোরের মানুষের কাছে কিন্তু অধ্যাবধি বনলতা সেন রক্ত মাংসের মানুষ, পরম আপনজন। এমন কি তাঁকে কেন্দ্রকরে স্থানীয় ভাবে গড়ে উঠেছে কয়েকটি কাহিনী। যদিও এসব কাহিনী ইতিহাসের কোনো সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হয় নাই তথাপি আসুন কাহিনী গুলি শোনা ?াক জীবনানন্দ দাশ একবার ব্যক্তিগত কাজে ট্রেনে করে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। তখনকার দিনে নাটোর হয়ে যেতো দার্জিলিং মেল। একাকী নির্জন কামরায় বসে আছেন কবি। হঠাৎ নাটোর ষ্টেশনে অপরূপ সুন্দরী একটা মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে উঠলেন এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধের নাম ভূবন সেন। তিনি নাটোরের বনেদি সুকুল পরিবারের ম্যানেজার। ভূবন সেনের সঙ্গিনী কামরায় তারই বিধবা বোন বনলতা সেন। অচিরেই পথের ক্লান্তিতে ট্রেনের কামরায় ঘুমিয়ে পড়েন ভূবন সেন। কামরায় জেগে থাকেন শুধু দু’জন-জীবনানন্দ দাশ আর বনলতা সেন। এই নীবর মুহুর্তে বনলতা সেনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন কবি। এমনিতেই মুখচোরা কবি, একান্ত একসঙ্গে কেটে যায় বেশ কিছুক্ষন। একসময় মাঝ পথে কোনো এক স্টেশনে নেমে যান বনলতা সেন। কামরায় আবার একা হয়ে যান জীবনানন্দ। বনলতা সেন চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন কবির মনে এক বিষন্নতার ছাপ। তারই অবিষ্মরণীয় প্রকাশ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে “থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন”। দ্বিতীয় কাহিনীর কেন্দ্রেও আছেন ভূবন সেনের বিধবা বোন বনলতা। তবে ঘটনাস্থল এবার ট্রেন নয় ভূবন সেনের বাড়ী। নাটোর বেড়াতে গেছেন %E0%A6%B6" target="_blank">জীবনানন্দ দাশ। অতিথি হয়েছেন নাটোরের বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর বাড় ীতে। এক দুপুরে সুকুল এস্টেটের ম্যানেজার ভূবন সেনের বাড়ীতে নিমন্ত্রন। ভূবন সেনের বিধবা বোন বনলতা সেনের ওপর পড়েছে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। খাবারের বিছানায় বসে আছেন কবি জীবনানন্দ দাশ

 

কবি জীবনানন্দের বনলতা সেনের অনুসন্ধান আর নাটোরের নামটি বাংলা সাহিত্যে হয়ে উঠেছে আর এক কিংবদন্তী নগরী। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমাদের আগ্রহ ও বিস্ময় প্রায় অন্তহীন। বিশ শতকের অ ?্যকোনো বাঙ্গালী কবি আমাদের কল্পনায় এমন প্রবল ভাবে দাগ কাটেনি। আজ ও তাঁর কবিতার অলঙ্কার শব্দ ব্যবহার এবং অধূনা আবিস্কৃত গদ্যের ভাষা আমাদের ক্রমেই বিস্মিত করে চলেছে। জীবনানন্দের মৃত্যুর ৫৯ বছর পরও তিনি সমকালীন বাংলা কাব্য সাহিত্যের প্রধান কবি হিসেবে অধিষ্টিত।

 

 

Source:
দৈনিক পূর্বদেশ
সুত্রঃ ছবি
Date: শুক্রবার , ২৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১:১৯ পূর্বাহ্ ?

 

Please follow and like us: