}

প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—

কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:

পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি॥ 


বয়স কতইবা আর তখন, সবে আঠারো! অথচ, সে বয়সেই লিখলেন কবি এমন একটি কালজয়ী কবিতা তাঁর ‘ছারপত্রে’। অবহেলিতের কবি, বঞ্চিতের কবি তাঁর দর্শনে মননে ছিলেন তাঁর বয়সের চাইতেও যোজন যোজন এগিয়ে। তাইতো তাঁর কবিতায় ক্ষুধার কথা উঠে আসে, উঠে আসে বঞ্চিতদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা। ওইটুকু বয়সেই কবি তাঁর চিন্তা আর মননে যেভাবে ক্ষয়িষ্ণু সমাজের ভঙ্গুর চিত্র অংকন করেছিলেন, সঙ্গত কারণেই তাঁকে সেরাদের কাতারে রাখতে হয়।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সেই বছর আকাল নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। কৈশোর থেকেই সুকান্ত যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে | পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তার কবিতার মূল প্রেরণা।


আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকতক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তার লেখা বিবেকান্দের জীবনী। মাত্র এগার বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতি নাট্য রচনা করেন।


এটি পরে তার ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালাতে পড়বার কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত।


 

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তার আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি।


 

মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন।


মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন।তার কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের সংকচিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তার কবিতায়। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো: ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তার রচনাবলি প্রকাশিত হয়।


 

সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও লৈখিক দক্ষতায় অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও সুকান্ত কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তার কবিতায়। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার সাহস সুকান্তের কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়।


 

সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান বলে দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশসহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজ প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তার বয়সিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন তার পরিণত ভাবনায়। ভাবনাগত দিকে সুকান্ত তার বয়স থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। 


 

সুকান্তের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার সুবাদে কবির পরিবার কলকাতায়ই থাকতো। দীর্ঘদিন কবির পরিবার সেখানে অবস্থান করায় তার পৈত্রিক ভিটাটি দখল হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৯ বছর দখল থাকার পরে ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কবির বাড়ি দখল মুক্ত হয়। দখল মুক্ত হওয়ার পরে কবির পৈত্রিক ভিটাটি দীর্ঘদিন শূণ্য অবস্থায় পড়েছিল। বর্তমানে জেলা পরিষদ কবির পৈত্রিক ভিটায় একটি অডিটেরিয়াম ও লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। এখানে কবির স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য প্রতি বছর মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি মেলার আয়োজন করা হয়।


 

কবির বাড়ির ঠিকানা জানতে কোটালীপাড়া শহরের মোড়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করতেই দেখিয়ে দিবে। মোড় থেকে ডান দিকে এগোলোই সরু পিচের রাস্তা। গ্রামের রাস্তা ধরে ১৫-২০ মিনিট এগোতেই দেখা মিলবে কবির পৈতৃক ভিটা। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় নানার বাড়িতে জন্মেছিলেন কবি সুকান্ত। কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামের এই বাড়িটি তাঁর বাবার ভিটা। এখানে কবির আত্মীয়স্বজন কেউই নেই। বাড়িটি পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহার করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। 


 

সেই চিরচেনা ছবি! গালে হাত দিয়ে বসে আছেন কবি। একবার নয়, দুই-দুবার কবির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। প্রথমে কোটালীপাড়া শহরের তিন রাস্তার মোড়টা পেরোতেই। একটু পরে উনশিয়া গ্রামে কবির বাড়িতে। দুয়ারে দাঁড়িয়ে যেন সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে কবি বলবেন- এসো হে জ্ঞ্যানপিপাসু, এসো। আমার দুয়ারে তোমাদের সুস্বাগতম। কবির বাড়িতে ঢুকতেই বাড়ির সামনেই বড় একটা পুকুর। শানবাঁধানো ঘাটও রয়েছে। বারান্দার সামনে রয়েছে কবির একটি মূর্তি। এক পাশে রক্তজবা ফুলের গাছ। উঠানে সবুজ ঘাস, লম্বা একটি বাগান। কবির ঘরে কবির লেখা নানা বই শেলফে থরে থরে সাজানো রয়েছে। আছে কবির একটি জলরঙের পোট্রেটও। কয়েকটি সোফা। বারান্দায় পড়ে আছে ভাঙা একটি ড্রেসিং টেবিল।


 

বাড়ির দেয়ালজুড়ে লেখা কবির বিখ্যাত সব লাইন, ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি/ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:/ পূর্ণিমর-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’; ‘মুখে-মৃদু-হাসি অহিংস যুদ্ধের/ ভূমিকা চাই না। ডাক ওঠে যুদ্ধের।’; ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়:/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ কবিতাগুলো পড়তে পড়তে যেন কবিকে নতুন করে আবারো আবিস্কার করতে হয়!


 

সড়ক পথে ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে পলাশ, ইমাদ, টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, গোল্ডেন লাইন, গ্রিনলাইন, রাজধানী ও বিআরটিসি বাসে টুঙ্গিপাড়া যাওয়া যায়। গোপালগঞ্জ থেকে লোকাল বাসে কোটালিপাড়া উপজেলায় এসে স্থানীয় যানবাহনে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কবির বাড়িতে পৌঁছতে পারবেন।


 

গোপালগঞ্জ শহরে হোটেল শিমুল, হোটেল মধুমতি, হোটেল রানা, পলাশ গেস্টহাউজে থাকতে পারবেন।


 



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন