}

সবুজে শ্যামলে ছায়া ঢাকা একটি গ্রাম। তার গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে কুমার নদী। শান্ত জলের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে দুই একটি ছইওয়ালা নৌকা। কিছু পাতিহাঁস। থেকে থেকে কয়েকটি কলা গাছ দুলছে। পাখ-পাখালির ডাকে হঠাত মাঝে মাঝে হয়ত ঘুম ভাঙছে এই প্রাসাদটির। যে প্রাসাদ আজ ৪০০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। স্থানীয়ভাবে যাকে সবাই শিকদার বাড়ি নামেই চেনে। 


ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ৬ কিঃমিঃ পরে দক্ষিণ পশ্চিমে এবং কানাইপুর বাজার থেকে উত্তরে ফরিদপুর-যশোর মহাসড়কের কাছে কানাইপুর গ্রামে এর অবস্থান। বাড়িটি কুমার নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। বাড়িটির পূর্বপাশ দিয়ে গ্রামের একটি মেঠোপথ চলে গেছে। 


এ বাড়িটির দুটি অংশ রয়েছে । একটি বাইরের ও আরেকটি ভিতরের অংশ। ভবনটির পূর্ব দিকের বারান্দার মাঝখানে একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এই প্রবেশপথ দিয়ে সহজেই ভবনের বাইরে ও ভেতরের আঙিনায় ঢুকতে পারা যায়। অন্যদিকে ভিতরের আঙিনায় ঢোকার জন্য দুটি প্রবেশ পথ রয়েছে। তবে পূর্ব পাশের পথটির ছাদ থাকলেও পশ্চিম পাশের পথটি উপরে খোলা। 


প্রসাদটির অভ্যন্তরে একটি দ্বিতল আবাসিক ভবন রয়েছে। ভবন সংলগ্ন চারপাশে খোলা বারান্দা আছে। ফরিদপুরের জমিদার শাসনের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ, এখানকার খ্যাতনামা জমিদার বংশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কানাইপুরের ‘শিকদার বংশ’। এদেরই বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষ আজ আমরা দেখতে পাই ‘শিকদার বাড়ি’ হিসেবে। 


বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদৌলার শাসনামলেরও প্রায় শতবছর পূর্বে এই জমিদার শিকদার বাড়ী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন থেকে জানা যায়। জমিদার হিসেবে শিকদার বংশের উন্নতি শুরু হয় ভবতারিনী শিকদারের আমল থেকে। বিধবা রানী ভবতারিনী তার একমাত্র সন্তান সতীশ চন্দ্র শিকদার এবং অপর এক বিপত্নিক কর্মচারীর সহায্যে তার জমিদারি পরিচালনা করতেন। তবে ভবতারিনীর পুত্র সতীশ চন্দ্র শিকদার সুশাসকের চাইতে উদ্ধত, অহংকারী এবং কুটনৈতিক হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। 


পরবর্তীকালে সতীশ চন্দ্র শিকদারের দুই পুত্র সুরেন্দ্র নাথ শিকদার এবং নিরদবরন শিকদারের মধ্যে জমিদারি ভাগাভাগি হয়ে যায় এবং সুরেন্দ্র নাথ বড় সন্তান হিসেবে জমিদারীর সিংহভাগ মালিকানা লাভ করে। সুরেন্দ্র নাথের অকাল মত্যুর পরে তার স্ত্রী রাধা রানি শিকদার জমিদারি পরিচালনা করা শুরু করেন। রাধা রানী শিকদারের মত্যুর পর পুত্রদের কোলকাতায় অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক ভাঙ্গনের কারণে এক সময়ে এই জমিদারি তৎকালীণ সরকার বাজেয়াপ্ত করে নেয়। 


সরজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে এটি অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে। খসে পড়েছে দেয়ালের বহুলাংশ। শ্যাওলা, আগাছা, বাসা বেঁধেছে এর পরতে পরতে। ইট, পাথর, সুরকিগুলো যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই অনাদরের। যৌবনের তেজী সিংহ পড়ন্ত বেলায় যেমন না খেতে পেরে হাড্ডিসার ভাগ্য বরন করে, অনুরুপ এই বাড়িটির বেলাতেও ঠিক তাই। 


তবে, এই বাড়িটির মেরামত দরকার। পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। একে টিকিয়ে রাখা দরকার। আর এর জন্য দরকার সরকারে সদিচ্ছা। যদি এটিকে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে সরকার  পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতো, তাহলে একদিকে সরকার যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হতো, তেমনি দর্শনার্থীরাও এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে পেত। সেই সাথে হত স্থানীয় কিছু কর্মসংস্থান। তাই বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার এই তো সময়।


গাবতলী থেকে সূর্যমুখী, গোল্ডেন লাইন, সাউথ লাইন ইত্যাদি বাস ফরিদপুর চলাচল করে। এছাড়া খুলনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ এবং যশোরগামী বাসে ফরিদপুর যাওয়া যায়। ফরিদপুর এসে বাস বা ইজি বাইকে কানাইপুর বাজার আসতে হবে। সেখান থেকে ৭-৮ মিনিট হাঁটলেই এই জমিদার বাড়িতে আসা যায়।


ফরিদপুর শহরে বেশ কয়েকটি মোটামোটি মানের হোটেল আছে। এর মধ্যে হোটেল র‍্যাফেলস, জে,কে ইন্টারন্যাশনাল, পদ্মা হোটেল এবং হোটেল ঝিলভিউ অন্যতম।


 


লেখকঃ এম, আর, খান সুমন