অম্লান স্থাপত্যকলা ও তুলনারহিত শিল্প সৌকার্যে নির্মিত অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডি মনোমুগ্ধকর কান্তজীউ মন্দির অবিভক্ত ভারতবর্ষের একাদশ আশ্চর্যের মধ্যে একটি। দিনাজপুর শহর থেকে ১৯কিলোমিটার উত্তরে ‘১২মাইল’ বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে ঢেপা নদী পার হয়ে ১কিলো মিটার দূরে কান্তনগরের নির্জন প্রান্তে কান্তজীউ মন্দির। মন্দিরের পাশ দিয়ে শীর্ণকায়া ঢেপা নদী মুদু বেগে ছুটে চলেছে। এটি আত্রাই নদীর একটি শাখা এবং দিনাজপুরের পুনর্ভবা নদীর মিলিত স্রোতের সাথে প্রভাবিত। শুধুমাত্র ঐতিহাসিকভাবে বহু পুরাতন এবং অসংখ্য স্মৃতি ও শ্র“তিময় পৌরাণিক জগতেও। দিনাজপুর গেজেটিয়ারের মতে অতি প্রাচীন কাল থেকে প্রসিদ্ধ ছিল এই স্থানের ইতিহাস। কথিক আছে পৌরাণিক যুগে এই অঞ্চলের নাম ছিল বিরাট রাজ্য এবং কান্তনগরে মহাভারত বর্ণিত বিরাট রাজার রাজধানী ছিল।

 

পৌরানিক কান্তনগর নামান্তরে শ্যামগড় নামেও পরিচিত ছিল। কান্তজীর মন্দির বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার মন্দির গুলোর মধ্যে সুন্দরতম এবং গাত্রময় পোড়ামাটির অলংকরণে ভরা একমাত্র মন্দির স্থাপত্য। এত উৎকৃষ্ট চিত্রফলকের নিদর্শন সে যুগে বাংলার আর কোন ইমারতে দেখা যায়নি। কান্তজীউ মন্দির  আকারে খুব বড় নয়। কিন্তু নামে ও ডাকে এটি এত প্রসিদ্ধ যে, এর সমতুল্য মন্দির বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। সুন্দর স্থাপত্য রীতি, অপরূপ গঠন বিন্যাস, মার্জিত শিল্প বিন্যাস, মার্জিত শিল্পচাতুর্য এবং সর্বোপরি উজ্জ্বল রক্তিম রূপের মাহাত্ম্যে এটি যেমন মহিমান্বিত, তেমনি সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল।মন্

?ির নির ?মাণের কাল নির্ণয়ঃ- ১৭০৪খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর বিখ্যাত রাজা প্রাণনাথ কর্তৃক কান্তজীউ মন্দির  নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পোষ্যপুত্র রাজা রামনাথের আমলে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মন্দিরের উত্তর দিকে ভিত্তিবেদীতে শিলালিপি দৃষ্ট হয়, তাতে উল্ল্যেখ আছে যে,

 

 

“শ্রীশ্রীকান্ত”
শাকে বেদাব্ধি কাল ক্ষিতি পরিগণিতে ভূমিপঃ প্রাণনাথঃ
প্রাসাদাঞ্চ্যতিরম্য সুরচিত নবরত্ম্যাখ্য মস্মিন্ন কার্যাৎ।
রু´ণ্যাঃ কান্ত তুষ্টৌ সমুদিত মনসা রামনাথের রাজ্ঞা
দত্তঃ কান্তায় কান্তস্য তু নিজ নগরে তাত সংকল্প সিদ্ধৌ”।।

 

 

অনুবাদ: প্রাসাদতুল্য অতিরম্য সুরচিত নবরতœ দেবালয়ের নির্মাণকার্য নৃপতি প্রাণনাথ আরম্ভ করেন। রুনীকান্তের (শ্রীকৃষ্ণর) তুষ্টির জন্য ও পিতার সংকল্প সিদ্ধির নমিত্ত ১৬৭৪শাকে (১৭৫২খ্রি.) নৃপতি রামনাথ কান্তের নিজ নগের (কান্তনগরে) কান্তের (শ্রীকৃষ্ণের) উদ্দেশ্যে এই মন্দির উৎসর্গ করেন।বেদ, অব্ধি, কাল ও ক্ষিতি এই শব্দ চারটির অর্থ যথাক্রমে ৪,৭,৩ ও ১ ধরে অঙ্কস্য বামাগতিতে এ মন্দির ১৩৭৪শাকে (১৭৫২খ্রি:) নির্মিত হয়েছিল বলে অনেকে ধারণা করেন। কিন্তু এ পাঠ ও ধারণা সর্বজন গ্রাহ্য নয়। কালকে ৩ (অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ) না ধরে ৬ (ছয় ঋতু) ধরলে লিপিতে পাঠ দাঁড়ায় ১৬৭৪শকান্দ (১৭৫২খ্রি:)। এ পাঠই সঠিক ও পন্ডিতমন্ডলী কর্তৃক সমর্থিত।মন্দির নির্মাণের অনুপ্রেরণাঃ- কান্তজীউ মন্দির  নির্মাণের বিষয় নিয়ে দিনাজপুর এলাকায় নানা গল্পকাহিনী, উপকথা ও কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। সাধারণ লোকমাত্রই বিশ্বাস

??রে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন বিশ্বকর্মা। এটি সম্পন্ন করতে বিশ্বকর্মার সময় লেগেছিল মাত্র এক রাত। আবার রাজা প্রাণনাথ এই মন্দিরের কাজ শুরু করেন এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিশেষ মতান্তর না থাকলেও তাঁর এই মহান কাজের উপলক্ষ্য সম্পর্কে একাধিক কাহিনীর সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। দিনাজপুরের ইতিহাস মতে কান্তজীউ মন্দির  নির্মাতা রাজা প্রাণনাথের আরো দু’জন বড় ভাই ছিল বামদের ও জয়দেব।দু’ভাইয়ের অকাল মৃত্যু হলে ১৬৮২খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসন লাভ করেন কনিষ্ঠ ভ্রাতা প্রাণনাথ।

 


একই সময়ে প্রাণনাথের শত্র“ জমিদার ছিলেন রাঘবেন্দ্র রায়। ঘোড়াঘাট ছিল রাজা রাঘবেন্দ্র রায়ের জমিদারী। প্রাণনাথের সিংহাসন লাভে রাঘবেন্দ্র ঈর্ষান্বিত হলেন এবং প্রাণনাথের দু’ভাইয়ের অকাল মৃত্যুকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগালেন তিনি। পারিবারিক ষড়যন্ত্রের দ্বারা প্রাণনাথ পর পর বড় দু’ভাইকে নিহত করে স্বয়ং সিংহাসন লাভ করেন-এই মর্মে তৎকালীন দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট মিথ্যা অভিযোগ করে প্রাণনাথকে বিপদের মুখে ঠেলে ফেলে দেয়া হয়। এছাড়াও অভিযোগে সংযুক্তি থাকে- প্রাণনাথের দুঃশাসন, প্রজাশোষণ, দিল্লীর দরবারে রাজস্ব না পাঠানোর হটকারিতা, মুঘল আনুগত্যের অস্বীকার ইত্যাদি। আওরঙ্গজেব উপস্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৈফিয়ৎ দেয়ার জন্য প্রাণনাথকে সমন জারি করেন। দিল্লীর ফরমান পেয়ে রাজ কাল বিলম্ব না করে যথা শীঘ্রই হাজার হাজার মাইল দুরত্ব অতিক্রম করে রাজধানী দিল্লীতে গিয়ে উপনীত হন। দিল্লী গমনকালে রাজা প্রাণনাথ মুঘল দরবারে প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে যান। উপঢৌকন সামগ্রীর মধ্য ছিল দিনাজপুর সুগন্ধ যুক্ত কাঠারীভোগ চাল ও চিঁড়া, %A6%95%E0%A6%BE+" target="_blank">ঢাকার বিখ্যাত মসলিন, রাজশাহীর গরদ, বহু হীরা-পান্না, মণি-মুক্তা ও বিরাট অংকের স্বর্ণমুদ্রা।

 

দিল্লীতে উপনীত হয়ে তিনি জনৈক হিন্দু পরিষদের আথিত্য গ্রহণ করেন এবং তাঁরই মাধ্যমে সমস্ত উপঢৌকন পেশ করেন দিল্লীর দরবারে। উক্ত পরিষদের সুপারিশক্রমেই রাজা প্রাণনাথের উপযুক্ত প্রমাণাদি সাপেক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগমালার নির্দোষিতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। রাজা প্রাণনাথের প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নম্র-ভদ্র ব্যবহার এবং মুঘল প্রীতি ও আনুগত্যের পরিচয়সহ মহামূল্য উপঢৌকন লাভ করে দরবার ও সম্রাট খুবই মুদ্ধ হন। প্রতিদানে দিল্লীর সম্রাট প্রাণনাথকে “রাজা” উপাধির দ্বারা ভূষিত ও সম্মাণিত করেন। যুগপৎ মিথ্যা অভিযোগ থেকে নি®কৃতি ও সম্রাট কর্তৃক সম্মানিত “রাজা” উপাধি লাভ করার অসীম আনন্দে প্রাণনাথের প্রাণ আনন্দে ভরে যায়। আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় রাজা ধর্মের জন্য একটি বিরাট কিছু করবেন বলে মনস্থির করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে তিনি কিছুদিনের জন্য পরম নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাভূমি শ্রীধাম বৃন্দাবনে অবস্থান করেন। ব্যক্তিগত জীবনে রাজা প্রাণনাথ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু।

 

তিনি সাধুস্বজনদের বিশেষভাবে পরিতোষ করতেন। শ্রীধাম বৃন্দাবনে অবস্থানকালে মন্দিরে রু´িনীকান্ত বিগ্রহ দেখে তিনি খুবই মুগ্ধ হন। তিনি যে কোন উপায়ে বিগ্রহ নিয়ে আসার জন্য সংকল্প করেন। তিনি প্রথমত আশাতীত অর্থ দিয়ে মন্দিরের পান্ডগণকে বশীভূত করে গোপনে বিগ্রহ আনার জন্য পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পান্ডগণ কর্তৃক তাঁর হীন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় অবশেষে সৈন্য দ্বারা বল প্রয়োগ করে বিগ্রহ অপহরণ করবেন বলে মনস

্থ করলেন। পরদিন প্রত্যুষেই মন্দি ?? আক্রমণ করার কথা ছিল। কিন্তু দৈব ঘটনায় প্রাণ নাথের সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে দেখা দিয়ে বলছেন- “ প্রাণনাথ ! আমি জানি, তুমি আমার ভক্ত। তবে আমার অন্য ভক্তদের মনে আঘাত দিয়ে জোর করে আমার বিগ্রহ নিয়ে যাবার চেষ্টা কর না। আমি স্বেচ্ছায় তোর সঙ্গে যাব। আগামীকাল প্রত্যুষে যমুনার জলে স্নান করতে যেও-দেখবে নদী সৈকতে একটি বিগ্রহ পড়ে আছে। সেই বিগ্রহ ও আমি অভিন্ন।” স্বপ্ন-যোগে শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার স্থান ও দিন-ক্ষণের কথাও জানিয়ে দিলেন।

 


প্রাণনাথের মনস্কাম পূর্ন হল। পরদিন প্রতুষ্যে যমুনার ঘাটে গিয়ে তিনি সত্যিই অনুরূপ একটি বিগ্রহ দেখতে পেলেন। বিগ্রহ পেয়ে তিনি কাল বিলম্ব না করে নৌকাযোগে দিনাজপুর অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। ফিরবার পথে তিনি আগ্রা থেকে কয়েকজন খ্যাতনামা স্থাপতিকেও সঙ্গে করে আনলেন কান্তজীর নতুন মন্দির গড়বার জন্যে। প্রাণনাথের নৌবহর বাংলাদেশের সীমানা পৌঁছে গঙ্গা নদীর ধারা বেয়ে ক্রমে পুনর্ভবা নদীর উজান দিকে চলতে লাগল। ক্রমে দিনাজপুর শহর ও রাজবাড়ী অতিক্রম করে নৌকা সোজা উত্তর দিকে বয়ে চলল। অবশেষে কান্তনগর (তখন এই স্থানের নাম ছিল শ্যামগড়) নামক স্থানে এসে প্রাণনাথের নৌকা আপনা আপনি থেমে গেল। শ্রীকৃষ্ণের আদেশ ছিল- যেখানে বিগ্রহ বহনকারী নৌকা আপনা থেকে থেমে যাবে, সেখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করবে। সেই অনুযায়ী প্রাণনাথ কান্তনগর নামক স্থানে বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। সেই থেকে এই স্থানটিন নাম হল কান্তন

গর। কান্তমন্দির লিপিতে আছে- ‘কা ?্তস্য তু নিজ নগরে’ অর্থাৎ শ্রীকান্তের নামে উৎসর্গীত নগর। শ্রীযমুনা সৈকতে প্রাপ্ত বিগ্রহ কি করে দিনাজপুর আনয়ন করা হয় এ বিষয়ে অন্য প্রকারের আরো অনেকে কথা প্রচলিত আছে। প্রবাদ এই যে, স্বপ্নযোগে বিগ্রহের সন্ধান দিয়ে সে বিগ্রহকে কোথায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সে সর্ম্পকে শ্রীকৃষ্ণ বললেন যে, “ তোমার স্বদেশে নীত প্রতিমার ভিতর থেকে একটি সুমুধর শব্দ নিঃসৃত হবে এবং সেই নিঃসৃত শব্দ যেখানে গিয়ে থেমে যাবে সেখানেই সুন্দর একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাকে বিগ্রহ স্থাপন করতে হবে।”

 


বলাবাহুল্য শ্রীকৃষ্ণের নিকট থেকে বিগ্রহ লাভ ও উপযুক্ত নির্দেশাদি প্রাপ্ত হয়ে রাজা প্রাণনাথ এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করেন যে, রাজবাড়ীর নিকট এসে প্রতিমার মুখনিঃসৃত শব্দ অবশ্যই থেমে যাবে, আর স্বীয় প্রাসাদেই স্থাপন করতে সক্ষম হবেন বাঞ্ছিত মন্দিরটি। কিন্তু তা আর হয় নাই। বিগ্রহবাহী নৌকা কাঞ্চন নদীর বুক চিরে আরো এগিয়ে চলে ছিলো উজান দিকে এবং রাজবাড়ী পেছনে ফেলে রেখে অবশেষে তা এসে উপনীত হয় শ্যামগড়ে। এই স্থানে পৌছাতেই হঠাৎ প্রতিমার মুখ নিঃসৃত শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। অগত্যা শ্রীকৃষ্ণের ইচছানুসারে মন্দির স্থাপন করতে হয় ঐ শ্যামগড়ে। কান্তনগরের মাটিতে বিগ্রহকে প্রথম যে স্থানে রাখা হয়, রাজা প্রাণনাথ সেখানে একটি ছোট মন্দির তাড়াতাড়ি নির্মাণ করে দেন। এক কক্ষ বিশিষ্ট সেই ছোট মন্দিরটি এখনো মুল মন্দিরের প্রাচীরের প্রায় ১০০ মিটার উত্তরে বর্তমান। তারপর শুভক্ষণ দেখে প্রকৃত মন্দিরটির ভিত্তি স্থাপন করা হয় এবং তা র্নিমাণ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। অন্য একটি প্রবাদে আছে যে, দিল্লীর দরবারে কৈফিয়ত দিয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তারই কৃতজ্ঞার নির্দশ

ন স্বরুপ প্রাণনাথ একটি মন্দির নি ?্মাণ করে দিবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন। সেই প্রতিজ্ঞার ফলশ্র“তি হল কান্তজীউ মন্দির। আবার অনেকে মনে করেন- বর্তমানে কান্তনগর নামে পরিচিত এই অতিপ্রাচীন ও পরিত্যাক্ত স্থান রাজা প্রাণনাথ নতুন করে আবাদ করতে চেয়েছিলেন। তাই ঢেপা নদীর তীরবর্তী এ স্থানে তিনি একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, এ তথ্যকান্তজীউ মন্দির  ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

 

 

 

Source

Shamolbangla24.Com

Image

Link