শোনা যায়, কোন এক অবসরপ্রাপ্ত বৈমানিক একান্ত শখের বশে শহর থেকে একটু দূরে নিজের মত করে গড়ে তোলেন এই রিসোর্টটি। যাতে তিনি ফুটিয়ে তোলেন নিপুণ এক আবহমান গ্রামবাংলার নিখুঁত প্রতিচ্ছবিটি। ইচ্ছে ছিল প্রকৃতির কাব্যে নিজেই হয়ত রাঙাবেন নিজের অবসর। শুনবেন পাখির কণ্ঠে গান। মিষ্টি কলতান। কিন্তু সঙ্গীহীন ভুবনে নিজের সাজানো বাগানে একা একা কতদিন কার ভালো লাগে বলেন! তাই খুলে দিলেন মুখরিত হতে নিজের মত করে নিভৃত হতে জনমানুষের দ্বার।  

 

যান্ত্রিক কোলাহল হতে দু’দণ্ড মুক্তি পেতে, নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় গ্রামীণ পরিবেশে একান্তে কাটাতে কে না চায়! সাথে পাখ-পাখালির দুরন্তপনা,  বিস্তৃর্ণ সবুজের মাঠ, মাঁচা করা কুটির, যে দিকে দু’চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ, পাশের খালে সবুজ কচুরিপানা, ছোট্ট ডিঙি নৌকার মৃদু দোলুনি, সত্যিই আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কোন কল্পরাজ্যে। এর ওপর বাড়তি পাওনা যদি হয় গ্রামবাংলার বারোয়াড়ি ভর্তা, পুকুরের টাটকা মাছ থেকে শুরু করে জিভে জল আসা সব খাবারের মেন্যু, তবে তো কথাই নেই। গাজীপুরের পুবাইলে ৯০ বিঘা জমির উপর এমনই এক জায়গার অবস্থান  ‘জল ও জঙ্গলের কাব্য’।

 

গ্রামীণ পরিবেশে তৈরি পুরোটা এলাকাজুড়ে ১০-১২টা শেড রয়েছে। এর এক একটি শেডের একেক একেকটি নাম, আর আলাদা আলাদা ধরণ। কোনটা বকুল তলা, কোনটা বট তলা নামে পরিচিত। এমন রয়েছে আরও। মাঝে মাঝে তার চলে গিয়েছে আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। একপাশে ঢেঁকিতে ছাঁটা হচ্ছে চাল,  আটা দিয়ে হচ্ছে রুটি,  চিতই পিঠা, আর অন্য পাশে বিশাল হেসেল- পুরোদমে চলছে নিত্য খাবারের প্রস্তুতি। চা-ঘরে দু’ পা ছড়িয়ে বাশের বেঞ্চিতে বসে হাতে গরম চায়ের মগ নিয়ে  চা পান করা, আর সেই সাথে পুকুরে সাঁতার কাটতে থাকা হাঁসেদের জলকেলি দেখতে পাওয়া সতিই ভাগ্যের ব্যাপার! যেন, একটি নির

??ভেজাল, কোলাহলমুক্, বিশুদ্ধ শৈল্পিক গ্রামীণ পটভূমি।

 

এছাড়াও আছে পাটিতে পা লেপ্টে বসে গ্রামীণ লোকশিল্পীদের কণ্ঠে মন উজাড় করা আবহমান বাংলার  গান শোনার সুবর্ণ সুযোগ। আছে মন চাইলেই ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে শাপলা শালুক কুড়োতে যাওয়ার অবকাশ। আছে অপার্থিব জোৎস্না দেখার এক বিরল হাতছানি! আর ভাগ্য ভালো থাকলে মেঘমুক্ত আকাশে দেখা মিলতে পারে সাত রঙে বাঁধা পড়া বাঁকা ধনুকের মত কারুকার্যময় রংধনু।

 

অনাবিল সবুজ, আর বিলের শান্ত জলে বড়শী হাতে একটি দুপুর কাটিয়ে দেয়া আপনার নিভৃতচারী মনের সাধ পূরণের জন্য যথেষ্ট হবে। বাঁশ, পাটখড়ির বেড়া, ছনের ছাউনি আর দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি জন্ম দিয়েছে এক পরিচ্ছন্ন গ্রামের ছোঁয়া। এছাড়াও এই রিসোর্ট-এ নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত ধান, শাক-সবজি এবং বিলের ধরা মাছ দিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয় বলেই এতে পাওয়া প্রকৃত স্বাদ, সুদাকাঁদা মাটির গন্ধ।

ঝুম বৃষ্টি হলে যেমন ছনের বাড়ির প্রকৃত সুখ অনুধাবন করা যায়, তেমনি তীব্রশীতে লেপ কাঁথায় গুটিসুটি হয়ে আস্বাদন নেয়া যায় কষ্টে থাকা জীবন ও মানুষের। কিংবা কাঠ-সুরকিতে আগুন জ্বালিয়ে হাত ও পায়ে তা দিয়ে নিয়ে নেয়া যেতে পারে পল্লী বাংলার স্বাদ। 

  

সারা বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকেই চলে আসতে পারেন এখানে। ঢাকা থেকে গেলে টঙ্গী স্টেশন রোড বা ৩০০ ফিট দিয়ে যাওয়া যায় সহজে। তাছাড়া জয়দেবপুর রাজবাড়ির পাশ দিয়েও যাওয়া যায়। পুবাইল কলেজ গেট থেকে জল-জঙ্গলের কাব্য মাত্র ৩ কিলোমিটারের পথ।

 

এখানে থাকতে চাইলে নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ নেওয়া হয় ২,০০০ টাকা।  সারাদিনের জন্য ১,৫০০ টাকা জনপ্রতি (সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর বিকেলে হালকা নাস্তা)। শিশু (৫-১০ বছর), কাজের লোক ও ড্রাইভার জনপ্রতি ৬০০ টাকা। খরচটা একটু বেশি মনে হলেও খাবার

??র বহরা দেখে মনে হবেনা যে, আপনি ঠকেছেন।

 

লেখকঃ এম, আর, খান সুমন