পাহাড় থেকে সদ্য কেটে আনা থরে থরে বাঁশের সাজানো ভেলা, ঘাটে বাঁধা রংবেরঙের বাহারি নৌকা, স্বচ্ছ পানির বুকে বড় বড় পাথর, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আদিবাসীদের ছন আর বাঁশের তৈরি ঝুলে থাকা ছোট্ট ছোট্ট বাড়িঘর, আর মায়াবী অরন্যের হাতছানি! যেন হ্যামিলিয়নের কোন বাঁশির সুর আপনাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে তার বুকে হারিয়ে যেতে! 


পাহাড়ি পাড়া, পাহাড়ি উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পথ, পাহাড়িদের সহজ সরল জীবন দর্শন, তাঁদের ঝুম চাষের সুস্বাদু খাবার উদরপূর্তিকরণ, ঝর্ণার বুকে সারাদিন লম্ফঝম্ফে মেতে থাকতে থাকতে কখন যে আপনার দিনটা কেটে যাবে তা খেয়ালই থাকবেনা আপনার। একেক সিজনে নাফাকুমের একেকটি রূপ, বড়ই রহস্যময়ী! বর্ষায় যেমন সাঙ্গু নদীর মত বাঁধভাঙা নাফাকুমের দেখা মিলবে, তেমনি শীতে নেতিয়ে পড়া দুর্বল ঝর্ণাধারার ভিন্ন রুপের দেখা ভ্রমনে ভিন্নতা আনবে।  


সাঙ্গু নদী ধরে রেমাক্রীর দিকে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে হয় নৌকা বেঁয়ে। প্রকৃতির দুহাতে সাজানো বাসর এতটা সুন্দর, নির্মল হতে পারে ভাবাই যায়না। নদীর দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। সবুজে মোড়ানো পাহাড় যেন মেঘের কোলে শুয়ে আছে অবলীলায়। কোন কোন পাহাড় এতই উঁচু যে তার চুড়া ঢেকে আছে মেঘের আস্তরে। প্রকৃতির খেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে চমৎকার এক জলপ্রপাত! সূর্যের আলোয় যেখানে নিত্য খেলা করে বর্ণিল রংধনু। ২৫-৩০ ফুট উপর হতে আছড়ে পড়া পানির আঘাতে ঝর্ণার চারিদিকে সৃষ্টি হয় ঘন কুয়াশার। উড়ে যাওয়া জলকণা বাস্পের সাথে ভেসে ভেসে শরীরে এসে পড়ে। রোমাঞ্চকর সে অনুভূতি! একে বাংলার নায়াগ্রা বললে খুব একটা ভুল হবেনা মোটেও।


নাফাখুম জলপ্রপাত বান্দরবান জেলায় থানচি উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। এই নামটি সৃষ্টির পেছনে চমৎকার একটি গল্প রয়েছে

নাফাখুম মারমা শব্দ। নাফা অর্থ 'মাছ' আর খুম অর্থ 'জলপ্রপাত'। রেমাক্রী নদীতে এক ধরনের মাছ পাওয়া যায়, যার নাম নাফা মাছ। এই মাছ সবসময় স্রোতের ঠিক বিপরীত দিকে চলে। বিপরীত দিকে চলতে চলতে মাছগুলো যখন লাফিয়ে ঝর্না পার হতে যায় ঠিক তখনই আদিবাসীরা লাফিয়ে ওঠা মাছগুলোকে জাল বা কাপড় দিয়ে ধরে ফেলে। এ থেকে এই ঝর্নার নাম দেওয়া হয়েছে নাফাখুম ঝর্না।


এটি বাংলাদেশের আমিয়াখুম জলপ্রপাত এর পরই দ্বিতীয় বড় জলপ্রপাত হিসেবে ধরা হয়। অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটি রেমাক্রি থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টা হাঁটার পথ দূরত্বে অবস্থিত। 


 সারা বছরই নাফাখুমে পর্যাপ্ত পানি থাকে। তাই এডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষজন বছরজুড়ে ছুটে যায় নাফাখুম ভ্রমণ এর উদ্দেশ্যে। বর্ষায় বেশিরভাগ সময় নাফাখুমের পানি বিপদসীমার বেশি থাকে বলে এই সময় নাফাখুম ভ্রমণের অনুমতি দেয়না স্থানীয় প্রশাসন। আবার শীতের শেষ থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) পানি অনেক কম থাকে বলে অনেকে এই সময়টায় যেতে পছন্দ করেন না। মোটের উপর বলা যায় বর্ষার শেষ থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত নাফাখুম ভ্রমণের সবচেয়ে সেরা সময়। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে যে মৌসুমেই যাননা কেন- নাফাখুম ভ্রমন যে আপনার জীবনে সেরা ভ্রমণগুলির একটি হয়ে বেঁচে থাকবে, সেটা বলাই বাহুল্য ।


 নাফাখুম ভ্রমণ খরচ মূলত বেশি হয় যাতায়ত খরচের কারণে। কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে আপনি খরচ কমাতে পারবেন। যেহেতু এক জিপে সর্বোচ্চ ১৩ জন বসতে পারে, এবং এক নৌকাতে গাইড সহ ৫ জন বসতে পারে, তাই খরচ কমাতে চাইলে টিমের সদস্যসংখ্যর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ আপনার টিমের সদস্য সংখ্যা হতে হবে ৪, ৯ বা ১৩ জন।


নাফাখুম যেতে হলে প্রথমে বান্দরবান যেতে হবে। ঢাকা থেকে এসি, নন এসি সব ধরণের বাসই বান্দরবান যায়। নন এসির মধ্যে শ্যামলী, সৌদিয়া, ইউনিক, ডলফিন, সেন্টমার্টিন, এস আলম ইত্যাদি পরিবহনের বাস পাবেন।


 

থানচিতে থাকার জন্য একটি সরকারী রেষ্ট হাউজ আছে। রুম ভাড়া ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। কিন্তু থানচিতে রাতে না থাকাটাই উত্তম, অযথা টাকা ও সময় নষ্ট। সময় বাঁচাতে চাইলে রেমাক্রিতে থাকাই ভালো। এখানে আদিবাসীদের ঘর ও তাদের ছোট কটেজ আছে। জনপ্রতি থাকার খরচ পড়বে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।


থানচি বাজারে মোটামোটি মানের কয়েকটা হোটেল আছে। এর যে কোনোটাতে খেতে পারেন। আর রেমাক্রিতে খাওয়ার ব্যাবস্থা হয় আদিবাসীদের বাড়িতে কিংবা দোকানে। খেতে চাইলে আগে থেকে বলে রাখতে হবে। খাবার সাধারণত প্যাকেজ সিস্টেমে বিক্রি করে। প্রতিবেলা খাবার খরচ পড়বে ১২০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে।


তো, এমন একটি ঝর্ণা দেখতে, প্রকৃতির সাথে সঙ্গ দিতে আর দেরী কেন! তৈরি হয়ে নিন যত তারাতারি সম্ভব নিজের লাগেজপত্র গুছিয়ে।


 



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন