বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত নদীটির নাম নাফ নদী। এটি আরাকান পর্বত থেকে প্রবাহিত এক নদী, যা কক্সবাজার এবং আরাকানকে আলাদা করে রেখেছে। মায়ানমারের আরাকান পর্বত থেকে তিনটি প্রধান স্রোতধারা বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলার হোয়াক্যাং-ইউনিয়নের-এর পূর্ব দিকে মায়ানমারের কিছু ভিতরে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত স্রোতধারা নাফ নদী নামে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ দিকে সরলভাবে প্রবাহিত হয়ে  বঙ্গোপসাগরে  পতিত হয়েছে।

 

 

নদীর গঠনগত বর্ণনা

নদীটির দৈর্ঘ্য ৬৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১৩৬৪ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। নাফ নদীর গড় গভীরতা ১২৮ ফুট (৩৯ মি), এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৪০০ ফুট (১২০ মি)। এর প্রস্থ স্থান বিশেষে ১.৬১ কিমি হতে ৩.২২ কিমি হয়ে থাকে। মূলত এটি কোন নদী নয়, বঙ্গোপসাগরের বর্ধিত অংশ। সাগরের সাথে সরাসরি সরলভাবে সম্পৃক্ত থাকায়, এর জোয়ার-ভাটা সাগরের মতোই হয়। এর পানি তাই লবনাক্ত। এই কারণে মিষ্টি পানির মাছ এই নদীতে পাওয়া যায় না। নাফ নদীর মোহনাতেই শাহপরী দ্বীপ এবং সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ অবস্থিত যা বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থানগুলোর মাঝে একটি।  নদী তীর সং

??্ন জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত উপকূলীয় সমভূমি (যেমন- কদভূমি) ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষে ব্যবহূত হয়। তাছাড়া এই নদীর তীরে রয়েছে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর- টেকনাফ বন্দর এবং মায়ানমারের আকিয়াব বন্দর।

 

 

ইতিহাসের পাতায় নাফ নদী

ইতিহাসের পাতায় নাফ নদী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। এর মধ্যে রয়েছে, মায়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক জেলে ও শরণার্থীদের গুলিবর্ষণ, বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি কর্তৃক বার্মার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানো এবং সবশেষে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গার মায়ানমার থেকে নাফ নদী দিয়ে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ। এধরণের ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্তরূপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলোঃ

 

  • ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ — মায়ানমারের আধাসামরিক বাহিনী লুন টিনের সদস্যরা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে দিকে আসা ২০ জন শরণার্থীকে গুলি করে হত্যা করে।
  • ২৪ মার্চ ১৯৯৪ — মায়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের একটি দল নাফ নদীতে ছোট নৌকার মাধ্যমে মাছ শিকার করছিল, এসময় মায়ানমার সেনাবাহিনীর পশ্চিমের কমান্ডের সদস্যরা জেলেদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেন কিন্তু জেলার টাকা না দিতে পারায় তাদেরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মায়ানমারের মাংডু শহরের বালু খালি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। ৫ দিন ধরে ৮ জন রোহিঙ্গা জেলেকে নির্যাতনের পর তাদে ?? ফা

    ??়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

  • ২৭ অক্টোবর ২০০১ — নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় বার্মার সীমান্ত রক্ষী বাহ ?নী একজন বাংলাদেশিকে হত্যা করে, ২ জনকে আহত করে এবং ১৩ জনকে অপহরণ করে।
  • ২২ জানুয়ারি ২০০৫ — নাফ নদী অতিক্রম করার সময় মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ৭০ জনকে গুলি করে হত্যা করে। অস্ত্র বিহীন এতোগুলো মানুষকে হত্যা করার পর মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া জন্য বলা হয়েছিল যে, লোকগুলো চাল পাচারের সাথে জড়িত বলে তাদের সন্দেহ হওয়ায় গুলি চালিয়েছে তারা।
  • জুন ২০১২ — মায়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। অবশ্য বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী তাদের বেশ কয়েক দলকে ফেরত পাঠিয়েছিল। ২০১২ সালের ১১ই জুলাই মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি থেইন সেইন মায়ানমার থেকে সব রোহিঙ্গাকে বহিষ্কারের কথা বলেন অথবা জাতিসংঘে প্রস্তাব করেন ৩ লক্ষ রোহিঙ্গাকে অন্য কোথায় স্থান্তরিত করতে, যদিও জাতিসংঘ প্রস্তাবটি সাথে সাথেই বাতিল করে দেয়।
  • আগস্ট ২০১৭বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের ঘুমডাম সীমান্ত চৌকির স্টেশন প্রধান বলেন, মায়নমারের সেনাবাহিনী শরণার্থী হিসেবে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের উপর গুলিবর্ষণ করেছে। এএফপির এক প্রতিবেদকের তথ্য মতে, তিনি পলায়নরত রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ ও সীমান্তে মাইন পেতে রাখার ঘটনা দেখেছে

 

 

নাফ যুদ্ধ

%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6" target="_blank">বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যকার যেকোনো উত্তেজনার বিষয়ে যখনই আলোচনা আসবে, তখনই অবধারিতভাবে চলে আসবে নাফ যুদ্ধের কথা। ২০০০ সালের ৮ জানুয়ারী এই যুদ্ধ শ রু হয়েছিলো। তিন দিনের এই সামরিক সংঘাতে নজিরবিহীনভাবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহ ??নী বাংলাদেশ রাইফেলসের ২৫০০ সৈন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ব্রহ্মদেশের সেনা ও নৌবাহিনীর দুই ডিভিশন সৈন্যের সামনে, যাদের সম্মিলিত লোকবল ছিল ২৫০০০ এর মতো।

 

 

১৯৬৬ সালে সীমান্ত নিষ্পত্তিকরণের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ও বার্মা সরকার একটি চুক্তিতে সম্মত হয়। এই চুক্তির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নাফ নদীর মধ্যস্থিত অংশকে দুই দেশের সীমান্ত রূপে নির্দিষ্ট করা হয়। কিন্তু মায়ানমারের অংশে নাফ নদীর বারোটি প্রশাখা আছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা সেই প্রশাখাসমূহে এমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারতো না, যা নাফ নদীর গতিপথে বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু তারা এই চুক্তি অগ্রাহ্য করে ২০০০ সাল নাগাদ বারোটির মধ্যে এগারোটিতেই বাঁধ নির্মাণ করে। যার ফলে নদীটির প্রবাহ বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসে এবং এর ফলে ২৫০০ একর জমি পানির নিচে চলে যায়। ২০০০ সালে বার্মা সর্বশেষ প্রশাখাতেও বাঁধ দিতে উদ্যোগী হলে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে বাদানুবাদের সূত্রপাত হয়। কয়েক দফা দুই দেশের মধ্যে উত্তপ্ত ও অশোভন ভাষায় চিঠি চালাচালিও হয়। এই বাঁধ হয়ে গেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হতো, যা টেকনাফ শহরের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে পারতো। ১৯৯৯ সালের শেষ নাগাদ কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাঁধ দেয়ার ?্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দেয়া ছাড়া অন্য

কোন রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। গোপনে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় যুদ্ধের।

 

 

যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ৮ তারিখ দুপুর আড়াইটায়। তৎকালীন বিডিআর জেনারেল ফজলুর রহমান সেদিন নিয়মিত সীমান্ত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে দিনাজপুরে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি কোড ওয়ার্ডের মাধ্যমে অপারেশন শুরুর আদেশ দেন। কোড ওয়ার্ড ছিল সরল এক শব্দ- বিসমিল্লাহ। ??ুদ্ধ শুরু হয়েছিলো টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নে তোতার দ্বীপ সংলগ্ন অঞ্চলে। এখানে নাফ নদীর একটি বাঁকের সামনে প্রথম গুলি শুরু করে বিডিআর। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই জয়-পরাজয় স্পষ্ট হয়ে যেতে থাকে। প্রায় ছয় শতাধিক সৈন্য ও বাঁধ নির্মাণের শ্রমিক বিডিআরের এই হামলায় বেঘোরে মারা যায়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রেঙ্গুনের কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ে। জেনারেল থান শোয়ে ৯ জানুয়ারী রেঙ্গুনে নিযুক্ত বিদেশী সাংবাদিক ও রাষ্ট্রদূতদের তলব করে ঘোষণা করে, বাংলার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবার কোন পরিকল্পনা বার্মার নেই। যে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কারণে সীমান্তে সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে, তা নিরসনে তিনি বাংলাদেশের সাথে নিঃস্বার্থ আলোচনার প্রস্তাব দেন।

 

 

ঐতিহাসিকভাবে ২০০০ সালের নাফ যুদ্ধ একটি অনন্য ঘটনা। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খান কতৃক চট্টগ্রাম অধিকারের তিন শতাধিক বছর পর এই প্রথম অত্র ভূখণ্ড দিয়ে একটি সামরিক আক্রমণ পরিচালিত হয় ২০০০ সালের জানুয়ারী মাসে। তাছাড়া ১৭৭৬ সালে মেজর জেমস রেনেলের অংকিত সুবা বাংলার মানচিত্র পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মুঘলদের সামরিক বিজয় রামু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। সেদিক থেকেও নাফ যুদ্ধ ?িল অনন্য, আরেকটি গভীরে সংঘটিত, এবং সম

্ভবত একটি নতুন ইতিহাসের সূচনার কথা।

 

 

তথ্যসূত্র