দু’পাশ অথৈ পানিতে থৈ থৈ। বিস্তৃর্ণ জলরাশি। যেন এক মহাসমুদ্র। তার বুক চিড়ে চলে গেছে দুধার বাঁধাই করা পাকা রাস্তার বেড়ি বাঁধ। রাস্তার পাশ ধরে সবুজ গাছের মিতালী। থরে থরে শুকোতে দেয়া হয়েছে সোনালী আঁশের পাটকাঠি। ছোট ছোট ট্রলার নিয়ে মাছ ধরছে জেলে। পুঁটি খলশে চাঁদা। দূর-দূরান্তে চিরকুটের মত ভাসছে কিছু গুচ্ছগ্রাম। যেন এক একটি দ্বীপ হাতছানি দিয়ে ডাকছে…


আয়.. আয়.. আমার কাছে আয়…। 


হাওর বাওরের জেলা কিশোরগঞ্জ। আবহমান বাংলার অন্যান্য গ্রামের মতোই অনিন্দ্য সুন্দর কিশোরগঞ্জ। চারদিক গাছগাছালিতে ভরা। দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ। কিশোরগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে নিকলী উপজেলায় অবস্থান এই নিকলি হাওরের।  ছোট ছোট গ্রাম, স্বচ্ছ জলের নাচন, মাছ ধরতে জেলেদের দিনভর ব্যস্ততা, হাওরের নানান স্বাদের মাছ। এসব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় এই নিকলীর অপরূপ হাওর ভ্রমণে।


এক দিকে রাতারগুলের মত ছোট ছোট জলাবন, হাওরজুড়ে গলা ডুবিয়ে থাকা হিজল গাছের সারি বা পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন কিংবা শুশুকের অহেতুক লম্ফঝম্ফ, অন্যদিকে পড়ন্ত সন্ধ্যার রঙ্গিন সূর্যাস্ত! যেন নিমিষেই আপনাকে নিয়ে যাবে কোন কল্পলোকে। নীরবে আমন্ত্রণ জানাবে একটি জোৎস্না রাতের সাক্ষী হতে। যেখানে চাঁদ আর হাওর একাকার হয়ে বিলীন হয়ে যাবে রুপালী আলোর- আলোকচ্ছটায়।


বর্ষা মওশুম হচ্ছে হাওরটি ঘুরে বেড়াবার উপযুক্ত সময়। তখন পানিতে পানিতে টুইটম্বুর। ভরা হাওরের মাধুর্য দেখার সুবর্ণ সুযোগ বৈকি! তাই তো পরিপূর্ণ হাওরের রূপ লাবণ্য আর যৌবন দর্শন করতে কিংবা তার বুকে গাঁ ভাসাতে হাজারো পর্যটকের ঢল নামে এই সিজনে। কিশোরগঞ্জ হাওর এমনই।


হাওরে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাবেন ছাতিরচরে। পানির নিচে ডুবন্ত এক সবুজ বন। লেয়ারে লেয়ারে সাজানো সুবজ গাছ। গাছের বুক বরাবর পানিতে ভাসতে থাকবেন আপনি। হুট করে দেখে আপনার কাছে মনে হতে পারে এটা হয়ত আরেকটি রাতারগুল। নিকলী বেড়িবাঁধ থেকে নৌকায় সরাসরি ছাতিরচর যেতে ঘণ্টাখানেকের পথ। নৌকায় ৩ ঘণ্টা ঘুরলে আপনি মোটামুটি অনেকটা জায়গা তৃপ্তি নিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন মুক্ত শ্বাস ভরে।


হাওরের জলাশয়ে জাল দিয়ে ঘেরা নানান রঙের হাঁস। এগুলোকে রঙ করা হয়েছে বিশেষ কারণে। কার হাঁস কোনগুলো বা হারিয়ে যেন না যায় সেকারনেই  অভিনব এ-পন্থা। মাছ ধরা যেহেতু এখানকার বাসিন্দাদের মূল পেশা, তাই পথে পথে যেতে যেতে দেখা যায় নানান জাল বোনার অভূতপূর্ব দৃশ্য। 


ঘুরে বেড়াতে চান? তবে, চাইলেই এখানে সহজে চার পাঁচশ টাকায় পেয়ে যাবেন ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা। আর বড় নৌকা ভাড়া করতে সাত থেকে আটশ টাকা খরচ পড়বে। তবে আপনি যদি আরও কিছুটা বেশী সময় হাওরের বুকে ভেসে বেড়াতে চান, সেক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি ভাড়া মাশুল গুনে- মন ভরে কাটিয়ে আসতে পারেন হৃদয় ভরে। রাতে থাকতে চাইলে নৌকার বুকেই থাকতে পারেন মাঝির সাথে কিছুটা অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে কিংবা অদূরেই কিছু ভালো মানের হোটেল রিসোর্ট আছে সেগুলোও বুক করে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে এলাকার চেয়ারম্যান গেস্টহাউজ কিংবা নিকলি থানার ডাক বাংলোটি আপনার থাকার জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি আদর্শ জায়গা হতে পারে।  


তো, আর দেরী কেন! দেশের যে কোন প্রান্ত থেকেই বাসে কিংবা ট্রেনে চেপে সিজন শুরুর প্রাক্কালেই চলে আসুন না প্রকৃতির এই বাসর দেখতে। মহনীয় হাওরের রূপ অবলোকন করতে। যেথায় প্রকৃতির সাথে মিশে আছে সাধারণ মানুষের মন। নীলের সাথে মিশে আছে বিস্তৃর্ন জলরাশি। সেই সাথে মিশে আছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা, অন্ন, বস্ত্রের সংস্থান।

মনে রাখবেন, নিকলি হাওর হতে পারে আপনার জীবনে অনেকগুলি ভ্রমনগল্পের মধ্যে আলাদা ভাবে মনে রাখার মত একটি বিশেষ ভ্রমণ গল্প।


ঢাকা থেকে সায়েদাবাদের কাছে গোলাপবাগ মাঠ থেকে কিশোরগঞ্জের দিকে বাস ছাড়ে। এক্ষেত্রেও কটিয়াদি নেমে যেতে হবে।


বাস ছাড়াও কিশোরগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন যোগাযোগ অত্যন্ত ভালো। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ৮টায় ছাড়ে আন্তঃনগরট্রেন এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস। বুধবার ট্রেনটির সাপ্তাহিক বন্ধ। ট্রেনে গেলে কিশোরগঞ্জের আগে গচিহাটায় নেমে তবেই নিকলির পথ ধরতে হয়।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন