চট্টগ্রাম শহরে বেড়াতে গেছেন, ফয়েজলেক ঘুরেছেন, চিড়িয়াখানা ঘুরেছেন, পতেঙ্গা সিবিচ ঘুরেছেন, অথচ পাশেই নেভাল একাডেমী বা নেভাল সিবিচ ঘুরে আসতে আপনি হয়ত বেমালুম ভুলে গেছেন; বা এমনও হতে পারে যে, আপনার নেভাল সিবিচ সম্পর্কে তেমন কোন পূর্ব ধারণা-ও নেই, তাহলে বলবো, আপনি মস্ত মিস করেছেন। কারণ, চট্টগ্রামের বুকে নয়নাভিরাম কয়েকটি দর্শনীয় জায়গার মধ্যে “নেভাল একাডেমী বা নেভাল সিবিচ” অন্যতম।


পতেঙ্গা সিবিচের পাশেই অবস্থান এই নেভাল একাডেমী বা নেভাল সিবিচের। এই বিচের বিশেষ বৈশিষ্ট হল এটি দিনের বেলায় যতটা-না সুন্দর দেখায়, তারচে’ ভয়ংকর সুন্দর রূপ ধারণ করে রাতের আঁধারে। যেন খোলস থেকে বেড়িয়ে এসে বৈচিত্র্যের পাখা মেলে সবার সামনে ধরা দেয় ময়ুরপঙ্খী হয়ে। এর ভিন্নধর্মী চরিত্রই এর সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ।। বিশেষ করে উঠতি বয়সী যুবক-যুবতীদের কাছে এর রহস্য উদ্ঘাটন আজও অপার বিস্ময়!


নেভাল একাডেমী মূলত কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষা একটি বেড়ি বাঁধ। যার পাড় বাঁধাই করে করা হয়েছে বসার সুবন্দোবস্ত। যার একটিই মূল রাস্তা। পতেঙ্গা সিবিচ ধরে নেভাল হয়ে এয়ারপোর্টের উপর দিয়ে সোজা চলে গেছে মুল শহরের কোলে। সকালে কিছুটা নিরিবিলি থাকলেও বিকেলের চিত্রটা হয় এখানে ভিন্ন। হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়ে নেভাল ফিরে পায় তার যৌবন। প্রাণ চাঞ্চল্য। সুনশান নীরবতা ভেঙ্গে জেগে উঠে হাজারো মানুষের কলকাকলিতে। ঠিক যেন বিকেলে সব ঘরে ফেরা- পাখীদের মতই।


রাস্তার উপর সারি সারি ছোট ছোট ক্যাফে। বেশীর ভাগই ফুসকা, চটপটি, কাঁকড়া ভাজা কিংবা টাটকা ভাজা পেয়াজু, ছোলার। সামনেই বসার জন্য কিছু চেয়ার টেবিল-টুল। আপনি বসতে বসতেই ঝটপট তৈরি হয়ে যাবে আপনার কাঙ্ক্ষিত গরম গরম খাবার।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাঁকড়া ভাজার স্বাদ নেয়ার পাশাপাশি আপনি উপভোগ করতে পারেন- বিকেলের অস্তমান লাল সূর্যটিকে।

এছাড়াও সারি সারি দোদুল্যমান ছোট ছোট নোঙর করা জাহাজ, কিংবা তীর ঘেঁষে চলে যাওয়া যাত্রীবাহী কিছু সাম্পান অথবা অদূরেই দলছুট হয়ে ছুটে চলা জাহাজের সাগর বুকে হারিয়ে যাওয়ার নান্দনিক দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর অবাক করবে, যখন নোঙর করা সারি সারি লাইটার জাহাজগুলো প্যারেডগ্রাউন্ডের সেনাদের মত জোয়ার ভাটার তালে তালে ওদের নিজস্ব দিক পরিবর্তন করবে। অর্থাৎ সকালে যা উত্তর দিকে দেখেছেন, বিকেলে তা দক্ষিন।  ঠিক যেন সূর্যমুখী ফুলের সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকার মত! 


সন্ধ্যা যত ঘনিয়ে আসে- নেভাল যেন আরও অপরুপ সাজে ধরা দেয় ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে। ঝিরি ঝিরি মৃদু-মন্দ হাওয়া, মেঘমুক্ত আকাশে বান ভাঙ্গা জোৎস্নার খেলা, জ্বলজ্বলে হাজারো তারার নীরব হাতছানি আপনাকে নিয়ে যাবে এক অদ্ভুত মায়াপুরীতে। যেখানে নেই জীবনের ঝঞ্ঝাট, নেই সংঘাত, নেই কোলাহল, নেই গৎবাঁধা- বাধ্যবাধকতা। যেন ব্যস্ত জীবন থেকে চেয়ে নেয়া এক টুকরো অবসর!


আর অদূরেই যুগ যুগ ধরে সাক্ষী হয়ে থাকা কাফকোর প্রজ্বলিত লাল বাতিকে মনে হবে যেন ডুবন্ত লাল সূর্য। যেন সাগরের বুকে বার বার হারাতে চাইছে নিজেকে লীন করে দিতে। তাই বলি, আলো আঁধারির এই বিরল মুহূর্তগুলো ক্যামেরা বন্দি করতে আপনাকে যে আসতেই হবে মায়াবী এই পুরীতে। নেভাল ছাড়া এমন সুযোগের হাতছানি আপনি আর পাবেন কোথায়?


শহর থেকে খুব কাছে হওয়ায় এই জায়গাটি এখন বিনোদনের মূল-প্রাণকেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। ট্রেন এবং বাস সচরাচর হওয়ায় দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে একদিনের ট্যুরে এখানে সহজে আসা যায়। সড়কপথে ঢাকা হতে ইউনিক, সৌদিয়া, শ্যামলী, হানিফ, সোহাগ, এস, আলম প্রভৃতি বাসের এসি/ননএসিতে আসতে পারেন।

আর ট্রেনে আসতে চাইলে সুবর্ণ এক্সপ্রেস , সোনারবাংলা এক্সপ্রেস, তুর্না নিশিথা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী/গোধূলি এক্সপ্রেসগুলোতে এসে ঘুরে যেতে পারেন।


এখানে থাকা খাওয়ার জন্য আশপাশেই গড়ে উঠেছে কিছু হোটেল রিসোর্ট। চাইলে কাছেই বাটারফ্লাই রিসোর্টটিতে থাকতে পারেন।  সেই সাথে পাশে পতেঙ্গা সিবিচ, বাটারফ্লাই পার্ক কিংবা এয়ারপোর্ট দিয়েও বেড়িয়ে আসতে পারেন। আর যদি আরও ভালো মানের হোটেলে উঠতে চান, সেক্ষেত্রে আপনাকে চট্টগ্রাম শহরে উঠতে হবে। সেখানে অনেক ভালো মানের হোটেল রয়েছে। তন্মধ্যে হোটেল লর্ডস ইন, হোটেল এশিয়ান, ল্যান্ডমার্ক এবং রেডিসন ব্লু’র নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যায়। সেগুলোতে বুকিং দিয়ে আপনি অনায়াসে কাটিয়ে আসতে পারেন আপনার মনের মত করে কয়েকটা দিন।  



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন