পতেঙ্গা সিবিচ বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর এবং জনপ্রিয় সিবিচ। এর আকর্ষণ এবং গ্রহণযোগ্যতা এখন এতটাই বেড়ে গেছে যে, বিশেষ করে যাঁরা চট্রগ্রাম বেড়াতে যান তাঁদের জন্য মুল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে এখন পতেঙ্গা সিবিচ। শহর থেকে খুব কাছে হওয়ায় মানুষ সহজে সেখানে যেতে পারে। আর দিনে দিনে এর অতি-আধুনিকায়নের ফলে এটি এখন ব্যাংককের পাতোয়াকেও রীতিমত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সেই দিনটিও হয়ত আর খুব বেশী দূরে নয়, যেদিন বিদেশী পর্যটকের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠবে এই উত্তাল বিচপ্রান্তর! 


ফুলে ফুলে সুশোভিত সুন্দর পরিপাটি বাগানে বাগানে সাজিয়ে তোলা হয়েছে আধুনিক সিবিচ। রঙবেরঙের চৌকোণা পাথর দিয়ে থরে থরে করা হয়েছে বসার সুবন্দোবস্ত, পাড় ঘেঁষে  নিরাপত্তা রেলিং, সেই সাথে আধুনিক ল্যাম্পপোস্ট দিয়ে ঘেরা পুরো পতেঙ্গা সিবিচ যেন একটি আধুনিক স্বপ্নের শহর! যতই দেখা যায়, ততই দেখতে ইচ্ছে করে...মন ভরেনা তবু!  


পতেঙ্গা সিবিচের সৌন্দর্য মূলত কয়েকভাবে মানুষের কাছে ধরা দেয়। ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ‌ নির্মল আমেজ আর সাগরের বুক ফুঁড়ে উঠা শ্বেতশুভ্র সূর্যোদয়ের দুর্বার মুহূর্ত! এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করে। সেই সাথে ছোট ছোট মাছ ধরা ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাঝিমাল্লারা চলে সাগরের পাড় ঘেঁষে। চিংড়ি, কাঁকড়াসহ সামুদ্রিক ছোট মাছ ধরে যে যার মত করে। দূর আকাশে দেখা যায় এক ঝাঁক উড়ন্ত বলাকা সারি বেঁধে উড়তে উড়তে মিলিয়ে যাচ্ছে দূর-দিগন্তে।


অদূরেই তার সারি সারি জাহাজ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়। পাখির সাথে পাল্লা দিয়ে কাছেই বিমান বন্দর থেকে ক্ষণে ক্ষণে উড়ছে উড়োজাহাজ। সকালের ঝিরিঝিরি মৃদুমন্দ বাতাস মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা লোকে। আর সেই সাথে আপনাকে প্রলোভন দেখাচ্ছে নিত্য একটি প্রাতভ্রমনের! যেন স্বপ্নের রঙ্গে সাজানো সিবিচটির চারিপাশ! 

বিকেলের পতেঙ্গা ধরা দেয় এক অনন্য রূপ নিয়ে। লাখো মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে পুরো সিবিচ প্রাঙ্গণ। কাঁকড়া ভাজা, বাদাম, বুট, চানাচুর, ডাব, নারকেল, ফুসকা, চটপটি, পানিপুরি, হালিম, পেয়াজু বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরব হয়ে উঠে নীরব সিবিচ। ভাটা পড়তেই ঘোর সওয়ার ডাকে তাঁর ঘোড়ায় সওয়ারি হতে, স্পিডবোড থেকে ডাক পড়ে সাগরে হারিয়ে যেতে, ফটোগ্রাফারের তৎপরতা বেড়ে যায় ছবি উঠাতে,  আর চারচাকা বিশিষ্ট সিবাইক চালিয়ে আপনি নিয়ে নিতে পারেন একটি বাইক চালানোর আস্বাদন! 


জোয়ারের সময় যেমন দেখা যায় আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউ, তেমনি ভাটার সময় আজবলাগা কাঁদা বালুময় লম্বা সিবিচ। সদ্য পড়া সে বিচের গা ঘেঁষে খালি পায়ে হাঁটার অনুভূতি অন্য রকম শিহরণ জাগাবে। আর দূর আকাশের ওই লাল টকটকে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আপনি কখন যে সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়বেন সেদিকে খেয়ালই থাকবেনা আপনার।  


সন্ধ্যার পর রাতের পতেঙ্গার ভিউটাই আলাদা। ঝকঝকে আলোকসজ্জার নীচে হাজারো মানুষের ঢল দেখে মনে হতে পারে যেন কোন ‘চাঁদের হাট’। আর তখন যদি জোয়ারের সময় হয় তাহলে তো কথাই নেই। শো শো শব্দে পাড়ে আছড়ে পড়ে উত্তাল ঢেউ। সবাই পাড়ে দাঁড়িয়ে অবলোকন করে রাজাধিরাজের এমন মহা-কর্মযজ্ঞ। যেন পৃথিবীটা খুবই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য তার কাছে। চাইলেই এক লহমায় গ্রাস করে নিয়ে যেতে পারে নিজের খেয়ালে। দু’চোখ যতদূর যায় শুধু পানি আর পানি। আর সে পানির বুকে স্থলভাগের এই আমরা, যেন নিতান্তই কিছু খড়কুটো। 


এছাড়াও পতেঙ্গায় রয়েছে বহুল পরিচিত বার্মিজ সুপার মার্কেট। চলে আসার সময় এখান থেকে আপনার পছন্দসই নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই আপনি সওদা করে নিতে পারেন অত্যন্ত সুলভ মুল্যে। এখানে আছে শামুক ঝিনুকের তৈরি নানান সামগ্রী, বার্মিজ আচার, শাড়ি, লুঙ্গী, কামিজ, কম্বল, খেলনা, ষ্টেশনারী ও নানান কসমেটিক সামগ্রী।

অনেক দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ শুধু কেনাকাটার উদ্দেশেই এখানে পাড়ি জমিয়ে থাকে।


বাংলাদেশের প্রতিটা প্রান্ত থেকেই সড়ক কিংবা রেলপথে পতেঙ্গায় খুব সহজে আসা যায়। সড়কপথে ঢাকা হতে ইউনিক, সৌদিয়া, শ্যামলী, হানিফ, সোহাগ, এস, আলম প্রভৃতি বাসের এসি/ননএসিতে আসতে পারেন। আর ট্রেনে আসতে চাইলে সুবর্ণ, সোনারবাংলা, তুর্না নিশিথা, মহানগর প্রভাতী/গোধূলি এক্সপ্রেসগুলোতে এসে ঘুরে যেতে পারেন।


আর রাতে থাকতে চাইলে কাছেই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বাটারফ্লাই  রিসোর্টটিতে উঠতে পারেন। অথবা যদি আরও সাধারণ মানের কিংবা ভালো মানের কোন হোটেলে উঠতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই চট্টগ্রামের মূল শহরে উঠতে হবে। তন্মধ্যে হোটেল লর্ডস ইন, হোটেল এশিয়ান, ল্যান্ডমার্ক এবং রেডিসন ব্লু’র নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যায়।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন