}
বগা লেক
বগা লেক
Jan. 5, 2021

বাংলার রূপ আমাদের চোখকে ফাঁকি দিলেও, কবি গুরুর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। কবি গুরুর ভাষায়-

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু

দেখা হয়নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া

একটি শিশির বিন্দু!

হ্যাঁ, সত্যিই তাই। যে সুন্দর খুঁজতে আমরা লক্ষ -হাজার টাকা খরচ করে বিদেশ বিভূঁইয়ে যাই, যে বিস্ময় খুঁজতে আমরা সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেই, সেই সুন্দর যেন আবহমান বাংলার প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজেই নিহিত! বিস্ময় তার পরতে পরতে। অথচ, আমরা তার খবরই রাখিনা। তেমনি একটি বিস্ময়কর অভূতপূর্ব সুন্দর জায়গার নাম  “বগা লেক”। যেটি বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অবস্থিত।

সমুদ্রপৃষ্ট হতে প্রায় ১২৪৬ ফুট বা ৩৮০ মিটার উপরে ১৫ একরের লেকটি দেখে  মনে হতে পারে পৃথিবী ছেড়ে চাঁদের বুকে বাসা বেঁধেছে যেন এক অজানা টুকরো স্বর্গ। শান্ত জলের শান্ত লেকটি যেন আকাশ থেকে এক মুঠো নীল চেয়ে নিয়ে নিজেও ধারণ করেছে সেই বর্ণীল রূপ। প্রকৃতি এখানে যেন ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। সুশোভিত স্নিগ্ধ মনলোভা মালভূমির খাঁজে খাঁজে বসতভিটার নান্দনিক ঐশ্বর্য।  মুগ্ধ নয়নে দেখতে হয় আকাশ পাহাড় আর জলের মিতালী। সব কিছু মিলে এ যেন এক সুন্দরের লীলাভূমি।

সকাল, সন্ধ্যা বা রাতে প্রতি বেলায়ই বগা লেক নতুন রুপে ধরা দেয়। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগালেককে দেয় স্নিগ্ধ সতেজ রূপ, ঠিক তেমনি রাতের বেলায় দেখা যায় ভিন্ন এক মায়াবী হাতছানি। রাতের বগালেক দিনের বগালেক হতে একেবারেই আলাদা। আর যদি রাতটি হয় চাঁদনী রাত তবে এটি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের কোন চিত্রকরের শিল্প! কি অসাধারণ সে রূপ! নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিড়ে হঠাৎ এক ফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বগালেকের শান্ত জলে। 

এখানে চাইলে বার-বি-কিউের ব্যবস্থাও করা যায়। লেকের পাড়ে বসে জোস্নার প্লাবন দেখতে দেখতে কাঠ-শুরকি জ্বালিয়ে শীতের হিম ঠাণ্ডায় নিজের শরীরকে গরম করার পাশাপাশি নিজেরাই করে ফেলতে পারেন বার-বি-কিউয়ের আয়োজন। এর জন্য কিছুটা পূর্ব প্রস্তুতি হলেই হয়। সেখানে বসে খুব কাছ থেকে রাতের বগালেকের সৌন্দর্য মনভরে উপভোগ করার পাশাপাশি আপনি পেতে পারেন এক স্বর্গীয় আমাজের তৃপ্তি!

এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। শৃঙ্গগুলো আবার উঁচু উঁচু বাঁশঝাড়ে আবৃত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫৭ মিটার ও ৬১০ মিটার উচ্চতার মধ্যবর্তী অবস্থানের একটি মালভূমিতে অবস্থিত। এর গভীরতা প্রায় ৩৮ মিটার (১২৫ ফুট)। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ— এ থেকে পানি যেমন বের হতে পারে না তেমনি কোনো পানি ঢুকতেও পারে না। অবাক করা বিষয় এর আশেপাশে কিন্তু পানির তেমন কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। তবে হ্রদ যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে প্রায় ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগা ছড়া নামে পরিচিত। এই হ্রদের পানি কখনও পরিষ্কার আবার কখনওবা ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানিরও রঙ বদলে যায়।

এই লেকটির সৃষ্টি নিয়ে রয়েছে অনেক পৌরাণিক কাল্পনিক কাহিনী। তবে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিকগণের মতে বগাকাইন হ্রদ মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার ভূমিধ্বসের কারণেও এটি সৃষ্টি হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন।

রহস্যময়ী এ হ্রদটিতে যদি বেড়াতে যেতে চান তাহলে বাংলাদেশের যে কোন স্থান থেকে

বগা লেক যেতে বান্দরবান জেলা শহরে আগে যেতে হবে। ঢাকার গাবতলী, শ্যামলী, কলাবাগানসহ অনেক টার্মিনাল থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে গাড়ি ছাড়ে। সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বাসগুলো ছেড়ে যায়। তবে কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামগামী যে কোন ট্রেনে গেলে আগে চট্টগ্রাম পৌঁছতে হবে। তারপর সেখান থেকে বাসে করে বান্দরবান। আর সেখান থেকে ১০ টাকা জনপ্রতি অটোবাইকে রুমা-থানচি চলে যাবেন।

রুমায় পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেলে দুপুরের খাবার রুমা বাজার থেকে সেরে নিন। মাছ-মাংস সবকিছু পাবেন। গাইডকে বলে দিন রাতের খাবারেরও ব্যবস্থা করে ফেলতে। স্থানীয় বমদের বাড়িগুলোর বাইরে টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা আছে। সেখান রাতের খাবার খেয়ে নিবেন। ডিম, ডাল, ভর্তা, মুরগির মাংস সবই পাওয়া যায় এখানে।

রাতটা বগা লেকে কাটাতে পারেন। থাকার মত কিছু কটেজ পাবেন। লেকের কাছেই কটেজগুলো। কটেজের ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা মাত্র। একটি কটেজ বাড়িতে ১২-১৪ জন থাকা যায়।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন