নানান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জ জেলা। তন্মদ্ধ্যে ‘বালিয়াটি জমিদার বাড়ি’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি উনিস শতকের স্থাপত্যকৌশলের একটি অন্যতম নিদর্শন। যে বাড়িটি থেকে তৎকালীন সময়ের মানুষের জীবন-জীবিকা, চাল-চলন, আনন্দ-বিনোদন আর শৌখিনতার বেশ পরিচয় পাওয়া যায়।


বালিয়াটি জমিদার বাড়ি প্রবেশের শুরুতেই কার্পেটের মত সবুজ ঘাসের গালিচার উপর নানান ফুলের বাগান আপনার চোখ ধাঁধিয়ে দিবে। এর দৃষ্টিনন্দন ইমারত, নির্মাণশৈলী, কারুকাজ এবং অলংকরণ এক কথায় অসাধারণ। এর বিশাল বিশাল ভবন তৎকালীন জমিদারদের বিত্ত বৈভবের অনেকটাই জানান দেয়। হাজারো ঝড়-তুফান, বৃষ্টি বাদলকে উপেক্ষা করে এখনও সগৌরবে দাঁড়িয়ে ২০০ বছরের পুরণো ভবনগুলো। 


জমিদার বাড়ির সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে এর সুবিশাল আঙ্গিনা। পাশাপাশি চার-চারটি বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এগুলোর পেছনেই রয়েছে তৎকালীন জমিদারদের অন্দরমহল, আর কয়েকটি পুকুর। শান বাঁধানো টলটলে পানির পুকুরগুলি সাক্ষ্য দিচ্ছে তার হারিয়ে যাওয়া অতীত, ঐতিহ্য। 


জমিদার বাড়ির রং মহল নামে খ্যাত ভবনে বর্তমানে জাদুঘর স্থাপনা করা হয়েছে। পুরো জমিদার চত্ত্বরটি উঁচু প্রাচীরে ঘেরা। এই প্রাসাদের ২০০ কক্ষের প্রতিটা কক্ষেই রয়েছে প্রাচীন শিল্পের সুনিপুণ কারুকাজ। প্রাসাদ চত্বরটি প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জমির উপর ছড়িয়ে থাকা সাতটি দালানের সমাবেশ। প্রতিটা দালানই উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত। জমিদার বাড়ির প্রবেশ দরজার দুপাশে রয়েছে দুটি তেজী সিংহের পাথরের মূর্তি। এর পরই নজরে আসবে প্রশস্ত আঙ্গিনা, যা বর্তমানে ফুলের বাগান। পেছনের অন্দরমহলে বিশাল আকারের পুকুর। পুকুরের একপাশে রয়েছে শৌচাগার।

পুকুরের চারপাশে রয়েছে শান বাঁধানো নান্দনিক ঘাট। বাড়ির প্রতিটি দেয়াল ২০ইঞ্চি পুরু। গাঁথুনিতে সিমেন্টের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে চুন-সুরকি আর শক্তিশালী কাঁদামাটি। লোহার রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে লোহার পাত। ভেতরে রয়েছে লোহার সিঁড়ি। ধারণা কয়া হয় সামনের চারটি প্রাসাদ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হতো। অন্দরমহলে গোবিন্দরাম বসবাস করতেন। 


 

বালিয়াটি প্রাসাদ

বালিয়াটি প্রাসাদটি স্থাপত্যকৌশলের অন্যতম নিদর্শন। সুবিশাল প্রাসাদটি ৫টি স্বতন্ত্র ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত। যার মধ্যে পূর্বদিকের একটি ব্লক ছাড়া চারটি ব্লকের দুটিতে একটি দ্বিতল ভবন এবং একটি টানা বারান্দা বিশিষ্ট ত্রিতল ভবন রয়েছে। প্রাসাদটির পেছনে অন্দরমহল। উত্তর দিকের ভবনটি কাঠের কারুকাজে তৈরি। সুবিশাল প্রাসাদটির চারপাশেই সুউচ্চ দেয়াল। প্রতিটি অর্ধ-বৃত্তাকার খিলান আকৃতির সিংহ খোঁদাই করা তোরণ বিদ্যমান।



গোলাবাড়ি

জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য শুরু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। আর এই গোলা বাড়িটি লবনের একটি বিশাল গোলা ছিল বলেই ধারণা করা হয়। জমিদাররা ধর্মপ্রাণ হওয়ায় বাড়ির মন্দিরে পুজা অর্চনা করা হত। স্বাধীনটা যুদ্ধে এখানে লুটপাট করা হয়।


 

পশ্চিম বাড়ি

জমিদার বাড়ির পশ্চিম অনশে অবস্থান বলেই বাড়িটির নাম পশ্চিম বাড়ি। ১৮৮৪ সালে জমিদারের উত্তরাধিকার জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী বিখ্যাত জগন্নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। 


পূর্ব বাড়ি

বালিয়াটির পূর্ব অংশে এ বাড়ির অবস্থান বলেই এ বাড়ির নামকরণ করা হয় পূর্ববাড়ি। এ বাড়ির প্রথম জমিদার পুরুষ রায় চান। তিনি দুটো বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তানদের সম্পত্তির দশ আনা অনশম এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সন্তানদের ডান করেন ছয় আনা অংশ।


দশ আনির জমিদার বাড়িটিই বর্তমান পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। এখানে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত চারটি সুবৃহৎ অট্টালিকা বিদ্যমান। এগুলো বড় তরফ, মেঝো তরফ, নয়া তরফ এবং ছোট তরফ নামে পরিচিত। ছয় আনির জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব বর্তমানে নেই।


বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকিটের মুল্য ২০টাকা। আর বিদেশীদের ক্ষেত্রে ১০০-২০০ টাকা হয়ে থাকে। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ জেলা সদর থেকে আনুমানিক ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং ঢাকা জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত। ঢাকার গাবতলী থেকে পাটুরিয়া, আরিচা বা মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বাসে চড়ে মানিকগঞ্জের ৮ কিমি আগেই সাটুরিয়া বাসস্টপে নেমে যেতে হবে।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন