}

প্রত্নতাত্ত্বিক জেলার শহর কুমিল্লা। ময়নামতি, শালবন বিহার, রুপবানমোড়া, ইটখোলা মোড়া, বায়তুল আজগর জামে মসজিদ, লালমাই পাহাড়, গোমতী নদী আর ধর্মসাগরের মত অসংখ্য ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দাঁড়িয়ে আছে এই কুমিল্লার বুকে। তন্মধ্যে, কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের চাঁন্দনাগেরচর গ্রামে অবস্থিত ১২৮ বছরের পুরনো মুসলিম জমিদারবাড়িটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 


পাখি ডাকা সবুজ শ্যামলে ঘেরা নিরিবিলি একটি গ্রাম। আঁকাবাঁকা রাস্তা পাশে বয়ে চলেছে নদী। চারদিকে বিস্তৃর্ণ ফসলের ক্ষেত। সবুজ দিগন্ত আর নীলাভ নদীর দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন আপনি এই জমিদার বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াবেন, মনে হবে বুঝি আপনি কোন ইটের দেশে এসেছেন। অতি সুচারুরূপে লাল ইটগুলোর প্রতিস্থাপন হতবিহ্বল করে দেয়। যেন আপনি এক লহমায় চলে যাবেন আজ থেকে ১৫০ বছর আগে, সেই জমিদারের আমলে। প্রতিটা ইট, সুরকি, দালানের কাজ আপনাকে সুদূর অতীতে নিয়ে যাবে।


সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বৃহত্তর দাউদকান্দি উপজেলা থেকে ভাগ হয়ে আসা তিতাস উপজেলায় অবস্থিত এই জমিদারবাড়িটি তিতাস উপজেলা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে ও দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর বাজার থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। 


নিপুণ কারুকাজমণ্ডিত তিনটি বাড়ি নির্মাণ করেন মাহাতাব ভূঁইয়া, তার দুই ছেলে আশরাফ ভূঁইয়া ও আরমান ভূঁইয়ার নামে। ২৩ কক্ষবিশিষ্ট রয়েছে তিনটি ভবন। প্রথম ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় তিনটি করে ছয়টি কক্ষ, দ্বিতীয় ভবনের নিচতলায় পাঁচটি ও দ্বিতীয় তলায় তিনটি কক্ষ এবং তিন তলাবিশিষ্ট তৃতীয় ভবনের প্রথম তলায় চারটি দ্বিতীয় তলায় চারটি ও তৃতীয় তলায় রয়েছে একটি বারান্দার মতো খোলা কক্ষ।


এই জমিদারবাড়িটির পাশে রয়েছে শৈল্পিক কারুকার্য খচিত কয়েকটি কক্ষ, রয়েছে একটি আন্ধার কোটা যেখানে রাখা হতো কাঁচাপয়সা ও স্বর্ণ মুদ্রা, একটি মসজিদ যেটি এখন সংস্কার করা হয়েছে মুসল্লিদের নামাজের জন্য, বৈঠকখানা যেখানে বসে জমিদারগন্ বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।


রয়েছে একটি ৬০ ফুট গভীর ইন্দ্রা কূপ। এই কূপের পানি মুসল্লিরা ওজুর কাজে ব্যবহার করতেন। আজও মুসল্লিরা নামাজ পড়তে এসে অজুর কাজে এই কূপের পানি ব্যবহার করেন; যদিও সংস্কারের আভাবে কূপের পানি থেকে এখন যথেষ্ট দুর্গন্ধ আসে।


এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ফুল মেহের বিবি (৯৮) জানান, জমিদারবাড়ির এ তিনটি ভবনের র্নিমাণকাজ শুরু হয়েছিল বাংলা সাল ১২৯৯-তে এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল ১৩০৬ সালে। ভবন তিনটি নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় সাত বছর। এবং সেই জমিদারবাড়ির ভবন তিনটি নির্মাণে ইটের জোগান দিতে জমিদার মাহতাব ভূঁইয়া নিজেই একটি ব্রিক ফিল্ড তৈরি করেছিলেন।


এলাকার আ. সামাদ ভূঁইয়া (৮৫) ও জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া (৭৫), বিশিষ্ট সমাজসেবী মো. মহসিন মাস্টার, হাসান মো. ডালিম ভূঁইয়া জানান, জমিদার মাহতাব ভূঁইয়া মারা যাওয়ার পর তার দুই ছেলে আশরাফ ভূঁইয়া এবং আরমান ভূঁইয়া জমিনদারি দেখভাল করতেন। পরে নাতি মুল্লুক চাঁদ ভূঁইয়া, নজুমদ্দিন ভূঁইয়া, আলিমুদ্দিন ভূঁইয়া, উজির ভূঁইয়া, নজির ভূঁইয়া, কালাই ভূঁইয়া, মজু ভূঁইয়াকে জমিদার বাড়িটিতে বসবাস করতে দেখা গেছে।


এক পর্যায়ে তার উত্তরসুরীরা কেউ গ্রামে কেউ শহরে আবার কেউ বিদেশ পাড়ি দেয়ায় জমিদার বাড়িটি অবহেলায় অযত্নে পড়ে আছে।


মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক সরকার জানান, প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি মজিদপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্য। এটি সংরক্ষণ ও দর্শনীয়ভাবে গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।


উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মোসা. রাশেদা আক্তার বলেন, এ বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি, তবে মজিদপুর চাঁন্দনাগেরচর অবস্থিত মুসলিম জমিদার বাড়িটির কথা যখন আমার কানে এসেছে এ ব্যাপারে ভাবতে হবে।


এ বিষয়ে ,ভূতাত্তিক, আঞ্চলিক পরিচালক (চট্রগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) ড. আতাউর রহমান জানান, এখন যদি করোনার প্রার্দুভাব না থাকত সবার আগে এই মুসলিম জমিদার বাড়িটি পরির্দশন করতাম। বিশেষ করে বাংলাদেশে মুসলিম জমিদার বাড়ির সংখ্যা খুবই কম।


তিতাসের চাঁন্দনাগেরচর গ্রামের জমিদার বাড়িটি আমাদের লিস্টেও নেই, পরির্দশনে জমিদার বাড়িটিতে যদি এমন কোন নির্দশন মিলে তাহলে আমরা এটিকে সার্ভে ও লিস্ট করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করব।


তিতাস উপজেলা একটি মুসলিমপ্রধান অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল তার প্রমাণ হচ্ছে, এই মুসলিম পরিবার ও জমিদারবাড়ি। তবে, এই বাড়িটির মেরামত দরকার। পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। একে টিকিয়ে রাখা দরকার। আর এর জন্য দরকার সরকারে সদিচ্ছা। যদি এটিকে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে সরকার  পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতো, তাহলে একদিকে সরকার যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হতো, তেমনি দর্শনার্থীরাও এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে পেত। সেই সাথে হত স্থানীয় কিছু কর্মসংস্থান। তাই বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার এই তো সময়।


ঢাকা থেকে যেকোন কুমিল্লার বাসে করে মুসলিম জমিদারবাড়িটিতে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে দাউদকান্দি নেমে তিতাস উপজেলায় যেতে হবে। যেহেতু এখানে থাকার তেমন কোন সুব্যবস্থা নেই সেহেতু দিন এসে দিনে চলে যাওয়াই উত্তম।


 


লেখকঃ এম, আর, খান সুমন