}

ঐতিহ্যের ধারক বাহক ময়মনসিংহ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শহর ময়মনসিংহ। এখানে এমনও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। তন্মধ্যে মহিলা ক্যাডেট কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ উল্লেখযোগ্য। আর ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরো বাংলাদেশ তো বটেই, তথা পুরো এশিয়াতেই প্রথম এবং একমাত্র কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়।   


 

ক্যাম্পাসটির কোল ঘেঁষে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্রহ্মপুত্র নদ। বর্ষায় এই নদটি তার যৌবন ফিরে পেলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় চরাঞ্চলে। অথচ, এই নদ এক সময় ছিল উত্তাল! পানিতে পানিতে টুইটম্বুর। কলকল রবে সরব হত নদীঘেঁষা ময়মনসিংহ শহর। জেলেরা নৌকা নিয়ে ধরত মাছ, শুশুকের দল লম্ফঝম্ফ করত এর বুকে। দেশের অনেক শরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের মূল মাধ্যম ছিল এই নদ।


 

এই নদ দিয়েই চলে যাওয়া যেত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অনেক আনাচে-কানাচের জেলায়। আজকের খরস্রোতা যে যমুনা নদী আমরা দেখতে পাই,  আদতে তা ব্রহ্মপুত্রেরই একটি প্রধান শাখা নদী। এখন সেই জৌলুস নাই। যেন রেখাপাতটাই পড়ে আছে। তারপরও  নদের ওপারের কাশবন, বিস্তৃত চর, রাখালের গরুর পাল নিয়ে বিচরন, কৃষকের ফসলী জমির চাষাবাদের দৃশ্য আপানাকে মুগ্ধ করবে। 


 

চারদিকে সবুজে ঘেরা সুন্দর পরিপাটি রাস্থাঘাট। নানান রঙের থোকা থোকা ফুল ফুটে রয়েছে দুই রাস্তার ধারে। গোলাপ, গাঁদা, কৃষ্ণচূড়া, চামেলী সব ফুলেরই দেখা মেলে এখানে। যতটা সুন্দর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাগুলো, তার চেয়ে বেশী সুন্দর এর টিপটপ চারিপাশ। যেন স্বপ্নের রঙে সাজানো প্রতিটা ক্যাম্পাস।


 

দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়৷ কৃষিবিজ্ঞানের সকল শাখা এর আওতাভূক্ত। মানসম্পন্ন উচ্চতর কৃষিশিক্ষা ব্যাবস্থার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে দেশে কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সক্ষম তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কৃষিবিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও কৃষি প্রকৌশলী তৈরি করাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। বিএইউ ২০১৩-২০১৪ সালের জন্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেটের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ওয়েবম্যাট্রিক্স বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিং ২০১৭ অনুসারে এটি বাংলাদেশের এক নম্বরের বিশ্ববিদ্যালয়।


 

ইতিহাস

১৯৬১ সালে ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ নামে দু’টি অনুষদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় তখন এর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঘোষণা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই পশুপালন অনুষদ নামে তৃতীয় অনুষদের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ এবং ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়।


 

অবস্থান


ময়মনসিংহ শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ১২০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী ঢাকা থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তরে এ ক্যাম্পাসের অবস্থান।


 

ভৌত স্থাপনা


বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল প্রশাসন ভবনসহ বিভিন্ন অনুষদীয় ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ২০০০ আসনের আধুনিক মিলনায়তন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, সম্প্রসারিত ভবন, জিমনেসিয়াম, স্টেডিয়াম, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, জিটিআই ভবন এবং শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য ১৩টি হল আছে। যার মাঝে ৪টি হল ছাত্রীদের জন্য। এছাড়াও রয়েছে ড. ওয়াজেদ মিয়া ডরমিটরী। 


 

গবেষণায় সাফল্য


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শস্যের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর মধ্যে বাউ-৬৩, বাউকুল, বাউধান-২, নামে উফশী ধান জাত- সম্পদ ও সম্বল, বাউ-এম/৩৯৫, বাউ-এম/৩৯৬ নামে ৪টি উফসি সরিষা জাত, ডেভিস, ব্র্যাগ, সোহাগ, জি-২ ও বিএস-৪ নামে ৫টি সয়াবিন জাত, কমলা সুন্দরী ও তৃপ্তি নামে আলুর জাত, লতিরাজ, বিলাসী ও দৌলতপুরী নামে তিনটি মুখীকচুর জাত, কলা ও আনারস উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি, রাইজোবিয়াম জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি, সয়েল টেস্টিং কিট, পেয়ারা গাছের মড়ক নিবারণ পদ্ধতি, বীজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সহজ পদ্ধতি, অ্যারোবিক পদ্ধতিতে ধান চাষ প্রযুক্তি, শুকানো পদ্ধতিতে বোরো ধান চাষ, পশু খাদ্য হিসেবে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির কলাকৌশল। আফ্রিকান ধৈঞ্চার অঙ্গজ প্রজনন, এলামনডা ট্যাবলেট, আইপিএম ল্যাব বায়োপেস্টিসাইড, বিলুপ্তপ্রায় শাকসবজি ও ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও মলিকুলার বৈশিষ্ট সনাক্তকরণ কলাকৌশল।


 

মোরগ-মুরগির রাণীক্ষেত রোগ ও ফাউলপক্সের প্রতিষেধক টিকা উৎপাদন, হাঁসের প্লেগ ভ্যাকসিন ও হাঁস-মুরগির ফাউল কলেরার ভ্যাকসিন তৈরি, রাণীক্ষেত রোগ সহজেই সনাক্তকরণে মলিকুলার পদ্ধতির উদ্ভাবন, মুরগির স্যালমোনোসিস রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি; হাওর এলাকায় হাঁস পালনের কলাকৌশল, কমিউনিটি ভিত্তিক উৎপাদনমুখী ভেটেরিনারি সেবা, গবাদিপশুর ভ্রুণ প্রতিস্থাপন, ছাগল ও মহিষের কৃত্রিম প্রজনন, কৃত্রিম প্রজননে ব্যবহৃত ষাঁড়ের আগাম ফার্টিলিটি নির্ণয়, গাভীর উলানফোলা রোগ প্রতিরোধ কৌশল, হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে গরু ও মহিষের গর্ভ নির্ণয়, সুষম পোল্ট্রি খাদ্য, গো-খাদ্য হিসেবে খড়ের সঙ্গে ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক ব্যবহার, হাঁস-মুরগির উন্নত জাত উৎপাদন।


 

কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী গবেষণা তৎপরতার মাধ্যমে টেকসই শস্যবীমা কার্যক্রম, ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রমের উন্নয়ন, পশুসম্পদ উপখাত ও ডেয়রি উৎপাদনের উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ে সেচনালা তৈরি, উন্নত ধরনের লাঙ্গল ও স্প্রে মেশিন, বাকৃবি জিয়া সার-বীজ ছিটানো যন্ত্র, সোলার ড্রায়ার, উন্নত ধরনের হস্তচালিত টিউবয়েল পাম্প, জ্বালানি সাশ্রয়ী উন্নতমানের দেশি চুলা, মাগুর ও শিং মাছের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল, ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, খাচায় পাঙ্গাস চাষ, পেরিফাইটন বেজড মৎস্যচাষ, দেশি পাঙ্গাসের কৃত্রিম প্রজনন, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মৎস্যচাষ, মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসেবে টিউবিফিসিড উৎপাদনের কলাকৌশল, পুকুরে মাগুর চাষের উপযোগী সহজলভ্য মৎস্যখাদ্য তৈরি, শুক্রাণু ক্রয়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তি, স্বল্প ব্যয়-মিডিয়ামে ক্লোরেলার চাষ, মাছের পোনা পালনের জন্য রটিফারের চাষ, মাছের রোগ প্রতিরোধকল্পে ঔষধি গাছের ব্যবহার এবং মলিকুলার পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছের বংশ পরিক্রম নির্ণয়, তারাবাইম, গুচিবাইম ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজনন, ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ, পুকুরে মাছ চাষ, সহজলভ্য মাছের খাদ্য তৈরি, একোয়াপনিক্সের মাধ্যমে মাছ এবং সবজি উৎপাদন, মাছের বিকল্প খাদ্যের জন্য ব্লাক সোলজার ফ্লাই চাষ এবং কচি গমের পাউডার উৎপাদন।


 

বাংলাদেশের কৃষি বিষয়ক একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত। দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়৷ কৃষিবিজ্ঞানের সকল শাখা এর আওতাভূক্ত। মানসম্পন্ন উচ্চতর কৃষিশিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে দেশে কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সক্ষম তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কৃষিবিদ, প্রাণিবিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও কৃষি প্রকৌশলী তৈরি করাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। ১৯৬১ সালে ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ নামে দু’টি অনুষদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।


 

ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে এটি এখনও মানুষের মন কেড়ে নেয়। ময়মনসিংহ শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ১২০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী ঢাকা থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তরে এ ক্যাম্পাসের অবস্থান।


 

কিভাবে যাবেন


 

ঢাকা থেকে সড়ক পথে ময়মনসিংহে আসতে হলে সৌখিন, এনা বাসে আসতে পারেন। এছাড়া ট্রেনে যেতে চাইলে আসতে পারেন সকালের তিস্তা এক্সপ্রেস কিংবা অগ্নিবীনা দিয়ে। সে ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে নামতে হবে। কোথায় থাকবেন চাইলে একদিনেই ঘুরে ফিরে আসতে পারেন। তবে যদি ময়মনসিংহ এর চারপাশে আরও কিছু জায়গায় ঘুরতে যান তাহলে নিম্নের হোটেল গুলোতে থাকতে পারেন- আমির ইন্টান্যাশনাল, হোটেল মুস্তাফিজ ইন্টারন্যাশলনাল, হোটেল হেরা, হোটেল সিলভার ক্যাসেল, হোটেল খাঁন ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি।


আর অব্যশ্যই দেখবেন আলেকজেন্ডার ক্যাসেল (শহরের ভিতরেই), মুক্তাগাছা রাজবাড়ি (ময়মনসিংহ থেকে মুক্তাগাছা বাস সার্ভিস রয়েছে। চাইলে মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজ মোড় থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়েও মুক্তাগাছা যেতে পারেন। মাথা পিছু ভাড়া পড়বে ২০ টাকার মতো), রামগোপাল পুর জমিদার বাড়ি (ময়মনসিংহ কালিবাড়ি রোডে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি), বোটানিক্যাল গার্ডেন(শহরেই অবস্থিত)।


 


লেখকঃ এম, আর, খান সুমন