কবি হাসান হাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুন, নবাব সিরাজউদ্দৌলা খ্যাত শক্তিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন এবং পরিচালক আমজাদ হোসেনের জন্মভুমি জামালপুর মূলত প্রসিদ্ধ হস্তশিল্প ও নকশীকাঁথার জন্য। এছাড়াও জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী পিঠালিরও সারা দেশে আলাদা সুখ্যাতি রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র আর ঝিনাই নদীর কোলে অবস্থিত জামালপুর শহরে নির্মিত হয়েছে একটি অত্যাধুনিক পার্ক এন্ড রিসোর্ট। ‘লুইজ ভিলেজ পার্ক এন্ড রিসোর্ট’। যে পার্কটি ময়মসিংহ বিভাগের মধ্যে অন্যতম আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র  হিসেবে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি পেয়েছে। 


টিকিট কেটে ঢোকার পর পরিচ্ছন্ন রাস্তার দুই ধারে নানা প্রজাতির সুবাসিত ফুল, গাছপালা আর সবুজ ঘাসের চোখ ধাঁধানো নানান কারুকাজে খচিত পার্কটি দেখে মনে হতে পারে কোন চিত্রকরের রঙের তুলিতে আঁকা সূনিপুণ কোন ছবি। পুকুরের উপর নির্মিত ওভারব্রিজ, চারপাশ সাজানো-গোছানো পরিবেশের নান্দনিকতার ছোঁয়া আপনাকে আলাদাভাবে আকর্ষিত করবে। 


কু-ঝিক ঝিক ট্রেনে চড়ে ছোট বেলায় মামা বাড়ি যেতাম। সে সময় সুপারি গাছের খোল দিয়ে খেলতাম ট্রেন ট্রেন খেলা। হয়ত দেখা যেত দুইজন চড়ে বসেছি ওই খোলটিতে, আরেকজন তা টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো উঠোনময়। এভাবে পালাক্রমে একেকজন চড়তাম, কু-ঝিক ঝিক খেলতাম। সে সময়ের কত সুখ স্মৃতি এখনও আনমনে উঁকি দিয়ে যায়।


ছোটবেলার  সেই সুখ স্মৃতি রোমন্থন করতে আপনার বাচ্চাদের নিয়ে নিজেও চড়ে বসতে পারেন লুইজ ভিলেজের- মিনি ট্রেনে। হয়ে যেতে পারেন নস্টালজিক।  ম্যারিগো রাউন্ড অথবা গোল্লাছুট খেলায় অংশ নিয়ে আস্বাদন নিতে পারেন কৈশোরের আত্মতৃপ্তিকে। আবার নাগরদোলা বা হানি সুইং-এ দোল খেতে খেতে আপনি চলে যেতে পারেন সেই  হারানো দিনের দুরন্তপনার দিনগুলোতে।

যেখানে গাছের ডালে দড়ি বেঁধে ছোটবেলার সেই দোল দোল- দোলনি খেলা; পেছন থেকে হয়ত ধাক্কা দিচ্ছে আপনার কোন খেলার সাথী, আর আপনি চোখ বন্ধ করে বিমানে চড়ার অনুভূতি নিয়ে খাচ্ছেন দোল; একবার সামনে, আরেকবার পেছনে।


প্যাডেলবোট কিংবা ইলেকট্রিক বোটে চড়ে আনমনে ঘুরে বেড়াতে পারেন পুরো পুকুরটি জুড়ে। বাম্পারকারে চড়ে শিশুরা নিতে পারে অফুরন্ত বিনোদনের উৎস। আবার ওয়ান্ডার হুইলে চড়ে উপর থেকে এক ঝলকে দেখে নেয়া যেতে পারে বহুল পরিচিত পুরো শহরটিকে।  


এছাড়াও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত মনোরম পরিবেশের এই পার্কের পুকুরটিতে রয়েছে নানান প্রজাতির রঙবেরঙের মাছ। সামান্য কিছু খাবার ছিটালেই দেখা যায়, হাজারো মাছের দল বেঁধে নিরন্তর কাড়াকাড়ির এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! যা বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের অন্য রকম বিনোদন যোগায়।


 লুইস ভিলেজ রিসোর্ট এন্ড পার্ক নামের রিসোর্টটি গড়ে তোলা হয়েছে জামালপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র বেলাটিয়া এলাকায়। রাশিয়ার মস্কো প্রবাসী আতিকুর রহমান লুইস এর ভ্রমন পিয়াসি উচ্চমান সম্পন্ন রুচিবোধ ও পরিবেশ বান্ধব ধারণায় এটি প্রতিষ্ঠিত। প্রায় ১০ একর জমির ওপর ২০১৬ সালে পার্কটি গড়ে তোলা হয়। গ্রামীণ পরিবেশের মাঝে গড়ে ওঠা এই পার্কটিতে বিরাজ করে নির্মল এক সবুজাভ পরিবেশ।


“লুইজ ভিলেজ পার্কের” অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে ছেলেমেয়েদের বার্ষিক বিনোদনের জন্যে একটি পিকনিক স্পট, অ্যাডভেঞ্চার রাইডস, কনভেনশ হল, কনসার্ট অ্যান্ড প্লেগ্রাউন্ড, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মুসুল্লিদের নামাযের স্থান, ডেকোরেটর, কার পার্কিং, ক্যাফেটেরিয়া শপ (যেখানে সব ধরনের খাবারই আপনি পেতে পারেন), সভা, সেমিনার স্থান এবং সুন্দর আবাসিক ব্যবস্থা। আপনি চাইলেই অনায়াসে কয়েকটা দিন নির্বিঘ্নে কাটিয়ে আসতে পারেন স্বপ্নের এই পার্কটিতে।


“লুইজ ভিলেজ পার্কের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা মাত্র। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্কটি খোলা থাকে। 


ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথ দুইভাবেই জামালপুর যাওয়া যায়। সড়ক পথের চেয়ে এখানে রেলপথটিই বেশি আরামদায়ক ও সুবিধাজনক। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন হতে আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস, যমুনা এক্সপ্রেস, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে জামালপুর যাওয়া যায়। এছাড়াও ঢাকার মহাখালী বাস স্টেশন হতে এনা, মহানগর ও রাজীব পরিবহণের বাস রয়েছে এই রুটে। 


পার্ক দেখার পাশাপাশি আরও কিছু জায়গা আপনি  দেখে আসতে পারেন। তন্মধ্যে, নব নির্মিত শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজ,  আন্তর্জাতিক মানের জেলা স্টেডিয়াম, বিডিআর ক্যাম্প, জর্জকোর্ট মোড়, নির্মিতব্য শহীদ মিনারসহ হযরত শাহজামাল (রহঃ) মাজার, যাঁর নামেই মূলত নামকরণ হয়েছে জামালপুর জেলার।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন