‘ব্যস্ততা দেয়না মানুষকে অবসর’। তাই ব্যস্ত জীবনকে রাহুমুক্ত করতে প্রয়োজন হয় একটু প্রকৃতির ছোঁয়ার। আর সেটা যদি হয় চারদিকে সবুজ অরণ্য আর ঘন গাছ-গাছালীতে ঘেরা, তবে তো কথাই নেই। ঠিক এমনি একটি পরিবেশ গাজীপুর চন্দ্রা থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে কালামপুর গ্রামের সোহাগ পল্লী এন্ড রিসোর্ট। দু’ধারে গজারি বনের বুক চিড়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যখন সোহাগ পল্লীর উদ্দেশে যেতে থাকবেন, তখন মনে হবে যেন, নিজেকে সঁপে দিতে চাইছেন সবুজ প্রকৃতির বুকে এক দুর্নিবার মায়ার টানে!  


ঢুকতেই মনকাড়া রাজকীয় তোরণটি আপনার চোখে পড়বে। ঢোকার পর বিস্তৃর্ণ সবুজ মাঠ। যেখানে দলে দলে শিশু কিশোরেরা খেলে কানামাছি, গোল্লাছুটসহ আরও অনেক খেলা। এছাড়াও বনভোজনে আসা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অফিস আদালতের লোকজন এখানে নানা রকমের ইভেন্টের আয়োজন করে থাকে। ১০০ মিটার দৌড়, বালিশ চালনা, কিংবা সেভ দ্যা চেয়ারের মত বিচিত্র সব খেলা। এছাড়া পাশেই রয়েছে বাচ্চাদের দোল খাওয়ার জন্য দোলনা এবং স্লিপার। 


মাঠটির একটু সামনেই দেখা যায় একটি শুটিং স্পট। সুন্দর পরিপাটি টিনশেডের একটি বাড়ি, সাজানো-গোছানো। এখানে বাংলা নাটক, সিনেমার অনেক শুটিং সম্পন্ন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তন্মদ্ধ্যে, রিয়াজ-শাবনুর, এটিএম সামসুজ্জামান অভিনীত ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ ছবিটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।


১১ একর উঁচু-নিচু জমির উপর এই রিসোর্টটি দাঁড়িয়ে আছে। এই রিসোর্টের অন্যতম আকর্ষণ হল বিশাল এক জলাশয়ের উপর নির্মিত অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত ঝুলন্ত সাঁকো। সকলের নজর কাড়ে এর পিলার ও বেলকনিতে খোঁদাই করা বিভিন্ন কারুকাজ।  যে সাঁকোতে ঢল নামে সব আগতদের। কেউবা সেলফি, কেউবা গ্রুপ ছবি, আবার কেউ বা একান্তে  সময় কাটিয়ে দেয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।


এছাড়াও এখানে রয়েছে একটি কৃত্তিম লেক। যাতে সব সময়ই পানি থাকে এবং সে পানিতে নানা প্রকারের রঙবেরঙের মাছ দেখা যায়। আর ঠিক লেকটির ওপাড়েই দেখা যায় গায়ে ডোরাকাটা চিত্রল হরিণের উপস্থিতি এবং সেই সাথে বানর বাবাজীর অযথাই লম্ফঝম্ফ! যা শিশুদের কাছে এই পার্কটির বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ! 


জলাশয়ের পূর্ব পাশে রয়েছে একটি দ্বিতল রেস্টুরেন্ট।  রেস্টুরেন্টটির নাম রাখা হয়েছে মেজবান। ১৫০ জন মানুষের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই মেজবানে খাবারের তালিকায় আছে- বাংলা, ভারতীয়, থাই, চীন খাবারসহ সব ধরনের খাবার। চাইলে আপনি জন্মদিনের পার্টি, বিবাহ, এবং কোনো পার্টির সাথে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা এখানে করতে পারেন। সঙ্গে, লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা তো আছেই। 


এ রিসোর্টে রয়েছে উন্নতমানের কয়েকটি কটেজ। চম্পা, লোটাস, রোজ, মালতি, পপি, শাপলা নামের এই কটেজগুলিতে এসি, ননএসির সূব্যবস্থা আছে। তন্মধ্যে ১৭টি এসি রুম এবং ২০টি ননএসি রুম। আপনি চাইলেই সাধ্যের মধ্যে থেকে যেতে পারেন এই কটেজগুলোতে।  


রয়েছে একটি সুদৃশ্য সুইমিং পুল।  নীল টলটলে স্বচ্ছ পানি আপনার মন কেড়ে নিবে।  সুপ্ত সাঁতারের বাসনা মুহূর্তেই জাগিয়ে তুলবে। মনে হবে যেন এতদূর এসে এই সুইমিং পুলে না নেমে চলে গেলে পুরো ভ্রমণটাই হবে বৃথা। তাই, সোহাগ পল্লীতে এসে সুইমিং পুলে সাঁতারকেটে যেতে মোটেও ভুলবেন না যেন।


এছাড়াও কনফারেন্সের জন্য একটি হল রুম রয়েছে। রয়েছে উঁচু পাহাড়। যার নীচে এক পাশে রাক্ষসের হাঁ করা মুখ এবং সে মুখের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া যায় ওই পাশে, উপরে সুন্দরী ললনার কোলে জলভর্তি কলসি এবং পাহাড়ের সামনে দু’দিকে দু’টি করে জিরাফ, হরিণ,এবং জোড়া সিংহের প্রতিকৃতিসহ গরুর গাড়ির সুনিপুণ ভাস্কর্য আপনাকে মুগ্ধ করে-ই ছাড়বে। 


ঢাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় এখানে খুব সহজে আসা যায়। সেক্ষেত্রে নিজস্ব পরিবহন থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। তাছাড়া  সিএনজি যোগেও আসা যায়। আর যাত্রীবাহী বাসে চড়ে আসতে চাইলে আপনাকে ঢাকা- টাঙ্গাইল মহা সড়কের চন্দ্রা মোড়ে নামতে হবে। পরে চন্দ্রা মোড় থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে কালামপুর গ্রামে আসলেই পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত সোহাগ পল্লীটির দেখা।



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন