}

অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির আর কোলাহলে সকালের ঘুমটি ভাংবে আপনার। এ যেন কোন গার্ডেন নয়, পাখির আড্ডাস্থল। দূরে সবুজে ঘেরা পাহাড়ের হাতছানি, পাহাড়ি মেঠোপথ আপনাকে নিয়ে যাবে মায়াবনে। যে বনের বুকে লুকিয়ে আছে হরিণ, ভালুক, বানর, খরগোশ এবং হনুমানসহ আরও অনেক বন্যপ্রাণী। উত্তেজনা আর ভয়মিশ্রিত চমৎকার একটি ট্যুর হতে পারে সীতাকুণ্ডের ইকো পার্ক তথা বোটানিক্যাল গার্ডেনে। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথ রির্জাভ ফরেস্ট ব্লকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুশোভিত চিরসবুজ বনাঞ্চলে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রেলপথের পূর্ব পাশে এর অবস্থান।


ইকো পার্কের ভিতরেই একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে সেখান থেকে অনেক দুর পযর্ন্ত দেখা যায়। দেখা যায় পুরো বনের নৈসর্গিক দৃশ্য। পাহাড়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া ঘোরলাগা আজব সন্ধ্যা, লাল সূর্যাস্ত, সবুজ অরণ্য, বৃক্ষরাজি, পাহাড়ের গা বেয়ে সর্পিল পাথরের সিঁড়ি এমন অনেক কিছু। যেন ড্রোনে বসে পুরো বনকে হাতের মুঠোয় দেখা।  


চট্টগ্রাম শহর হতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে এগুতে থাকলে প্রথমে পাহাড়তলী এবং তারপর একে একে কাট্টলী, সিটি তোরন, কুমিরা বাড়বকুন্ড অতিক্রম করতে করতে পূর্ব পাশে চোখে পড়বে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর চন্দ্রনাথ মন্দির, যার পাদদেশে অবস্থিত বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে ফকিরহাট বাজার সংলগ্ন মহাসড়কের পূর্ব পাশে রঙ্গিন ফটক সহ সাইনবোর্ড ইকোপার্কের দিক নির্দেশনা দেয়।


ইকোপার্কে প্রবেশের সাথে সাথে আপনি একটি বড় ডিসপ্লে ম্যাপ দেখতে পাবেন, যার মাধ্যমে আপনি ইকোপার্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারনা পাবেন। এ স্থান থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার, আপনি পায়ে হেঁ‌টে অথবা জীপ, মাইক্রোতে চড়ে সেখানে যেতে পারবেন। যে সকল ভ্রমনকারী প্রকৃতিকে ভালবাসেন প্রকৃতিকে খুব কাছের থেকে উপভোগ করতে চান তাদের অবশ্যই সীতাকুণ্ডে ইকো পার্ক এ আসতে হবে। 


উঁচুনিচু নির্জন পাহাড়, হরিণ, ভালুক, বানর, খরগোশ এবং হনুমানসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সমাহার, পাখ পাখালীর কলরব, প্রাকৃতিক ঝর্ণা, চিরসবুজ বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ ইকোপার্ক খুবই মনমুগ্ধকর। সন্ধায় পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন গোধূলীর রক্তিম আভা তৈরী করে ইকোপার্কে তখন এক নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। 


বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের প্রধান ফটকের ভিতরে ডান পাশে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের প্রধান নার্সারী এবং তার অফিস। এই নার্সারীতেই আছে দেশ-বিদেশের নানা প্রচলিত ও বিলুপ্ত প্রজাতীর ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ যেমন – অর্জুন, তেলসুর, চাপালিস, চুন্দুল, করই, জারুল, তুন, জাম, জলপাইসহ আরো অনেক। 


বোটানিক্যাল গার্ডেনে একটি চমৎকার অর্কিড হাউসও আছে। এখানে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতীর প্রায় ৫০ ধরনের অর্কিড আছে। সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি। এই এলাকা বিভিন্ন ধরনের গাছ, বুনফুল এবং গুল্মলতায় পরিপূর্ণ। সারা বছর জুড়েই অসংখ্য দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনায় এই স্থানটি মুখরিত থাকে।


এই চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকায় অনেক ছোট-বড় ঝর্ণা আছে। এই সকল ঝর্ণার মধ্যে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকার মধ্যে দুটো ঝর্ণা রয়েছে। ঝর্ণা দুটি সহস্রধারা ও সুপ্তধারা নামে পরিচিত। সহস্রধারা থেকে অবিরত পানি ঝরছে। কিন্তু সুপ্তধারা থেকে শীতকালে খুব কম পরিমান পানি ঝরে, তবে বর্ষাকালে এগুলো তাদের পরিপূর্ণ ধারায় আবর্তিত হয়। এখানে বলে রাখা ভাল এই সহস্রধারা ঝর্ণা সীতাকুণ্ডের ঐতিহ্যবাহী এবং ধর্মীয় তীর্থস্থান সহস্রধারা নয়।


এছাড়াও বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে খাবার পানি, রেষ্টহাউস এবং টয়লেট সহ পিকনিকের সকল সুযোগ সুবিধা বিদ্যামান। চাইলের দল বেঁধে ঘুরে আসতে পারেন এই সবুজের বুকে, যে সবুজের দেখা পেটে ছুটে এসেছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর মুগ্ধ হয়েছিলেন এর মায়াবিনী রুপে। 


বিআরটিসি’র বাসগুলো ছাড়ে ঢাকা কমলাপুর টার্মিনাল থেকে। আর অন্যান্য এসি, ননএসি বাস গুলো ছাড়ে সায়দাবাদ বাস ষ্টেশন থেকে। আরামদায়ক এবং নির্ভর যোগ্য সার্ভিসগুলো হল এস.আলম ও সৌদিয়া, গ্রীনলাইন, সিল্ক লাইন, সোহাগ, বাগদাদ এক্সপ্রেস, ইউনিক প্রভূতি। সবগুলো বাসই সীতাকুণ্ডে থামে। সীতাকুন্ড বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২ কিঃমিঃ দক্ষিণে ফকিরহাট নামক স্থান দিয়ে এ পার্কে প্রবেশ করতে হয়।


এখানে থাকার জন্য তেমন কোন ভালো হোটেল নেই। তবে চট্টগ্রাম থাকার জন্য চট্টগ্রামে রয়েছে বেশ কিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- হোটেল গোল্ডেন ইন, হোটেল টাওয়ার ইন ইন্টা: লি, হোটেল লর্ডস ইন প্রা: লি, হোটেল সিলমুন প্রা: লি, সেঞ্চুরি পার্ক লি, হোটেল প্যারামাউন্ট, হোটেল এশিয়ান এস আর, হোটেল সাফিনা, হোটেল নাবাইন , হোটেল ল্যান্ডমার্ক।


 



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন