}

দিনে যতটা না সুন্দর, তারচেয়ে অনেক বেশী সুন্দর রাতের আঁধারে। যেন দিনের সব ক্লান্তিকে ধুয়ে- মুছে ফেলে আলোক ঝলমলে রূপের ছটা নিয়ে ধরা দেয় রাতের দর্শনার্থীদের চোখে। চট্টগ্রাম শহরের বুকে নাভিশ্বাস উঠা যান্ত্রিক মানুষের মুক্তি দিতে এ যেন আরেকটি পালকের আধুনিক সংযোজন। যতই দেখা যায়, ততই মুগ্ধ হতে হয় নবনির্মিত পার্কটির সাজ-সজ্জা দেখে। 


এখানে সবচেয়ে বেশী দৃষ্টি কাড়বে যে জিনিসটি তা হচ্ছে জলাধারের বুকে ফোয়ারা। নানান রঙের মুখোশ ধরে যখন ফোয়ারাটি জলকেলি করতে থাকবে তখন আপনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন। সে এক হৃদয়হরণ মুহূর্ত! যে মুহূর্তটি অবলোকন করতে করতে অস্ফুটে হয়ত বলে উঠতে পারেন-অসাধারণ! এটা অবিশ্বাস্য!


প্রায় সাড়ে ৫০০ এলইডি বাতির আলো ঝলমল। এর মধ্যে বর্ণিল হয়ে উঠেছে দুটি ফোয়ারা। আড়াই হাজার ফুট দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা ৮ হাজার রানিং ফুটের ওয়াকওয়েতে আলো-আঁধারি আবহ। মাঝে সাড়ে ৩ ফুট গভীর ৫০ হাজার বর্গফুটের জলাধারে বইছে নির্মল হাওয়া। কৃত্রিম হ্রদের কিনারে বসার জন্য তিনটি দুই ধাপের গ্যালারি। মাঠজুড়ে ছোট ছোট সবুজের ঝোঁপ। মাঝখানে দুটি ছাউনি। মাঠের প্রান্তে বিশ্রামের জন্য স্থায়ী বেঞ্চ। এই হলো বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে সাজানো গোছানো জাম্বুরি পার্ক। উঁচু ভবন থেকে তাকালে মনে হয় কোন এক লেকসিটি।


আগ্রাবাদ সাড়ে আট একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এই পার্কটি। এতদিন সরকারি এই জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য ছিল। পরবর্তীতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের উদ্যোগে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গড়ে তোলা হয় এই পার্কটি। যা এখন দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।


প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশায় ৮.৫৫ একর জমির জমির ওপর রোপণ করা হয়েছে ৬৫ প্রজাতির হাজার হাজার গাছের চারা। এর মধ্যে আছে সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাধাচূড়া, বকুল, শিউলি, সাইকাস, টগর, জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। খোলা চত্বরে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবুজ ঘাস। পার্কে বসার সুুযোগও রাখা হয়েছে। আর শুধু হাঁটার জন্য রাখা হয়েছে ৮ হাজার ফুট পথ। 


নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ১৪টি ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। জলাধারের পাশে রয়েছে দুটি পাম্প হাউস। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি থেকে সুরক্ষার জন্য পুরো পার্ক সড়ক থেকে তিন ফুট উঁচু করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাস্টার ড্রেন। পার্কে প্রবেশের জন্য রয়েছে ছয়টি গেট। উত্তর পাশে দুটি, দক্ষিণ পাশে দুটি, পূর্ব পাশে ১০তলা ভবনের গেটের সামনে একটি, পশ্চিম পাশে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে একটি বড় গেট আছে। নাগরিকদের জন্য উত্তর-পূর্ব কোণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রাখা হয়েছে আধুনিক শৌচাগার।


পার্কে প্রবেশে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন বেঁধে দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে পার্ক। কিন্তু সেখানে খাবার নেওয়া যাবে না। জলাধারে গোসল করা যাবে না। গাছের ক্ষতি করা যাবে না।


পার্কে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ রেখেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। উদ্বোধনের আগে থেকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার হাজার হাজার মানুষ এটি দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছেন। তবে এখানকার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত সন্ধ্যার পর। আলো-আঁধারির ঝলকানি যে কারোর ভালো লাগবে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এখানে সেলফি তোলার ধুম পড়ে যায়।


জাম্বুরি পার্কের চার কর্নারে রয়েছে চারটি স্থাপনা। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব কোণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পার্কের অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে আধুনিক শৌচাগার। পার্কে প্রবেশের জন্য রয়েছে ছয়টি ফটক। উত্তর পাশে দুটি, দক্ষিণ পাশে দুটি, পূর্ব পাশে ১০ তলা ভবনের ফটকের সামনে একটি, পশ্চিম পাশে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে একটি বড় আকারের ফটক আছে।


১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি সাজিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এটাকে বলা হচ্ছে চট্টগ্রামের সেরা পার্ক। বহুতলা কলোনি, সিডিএ আবাসিক এলাকা, ব্যাংক কলোনি, টিঅ্যান্ডটি কলোনি, পোস্ট অফিস কলোনিসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় জাম্বুরি পার্কটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করা হলে নতুন পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে এই জায়গা।


ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম জিইসি মোড় নেমে লোকাল বাসে আগ্রাবাদ বাদামতল মোড়ে নামবেন। সেখান থেকে হেঁটে বা রিক্সাযোগে জাম্বুরি পার্ক। অথবা চট্টগ্রামের যে কোন জায়গা থেকে সিএনজি বা গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি জাম্বুরি পার্কে আসা যাবে।


 



লেখকঃ এম, আর, খান সুমন