}

বিশেষ কোন খাবারের প্রসঙ্গ যখন এসে গেছে তবে লিন ইয়ুটাং এর একটি উক্তি দিয়েই শুরু করা যাক- “কোন বিবেক সম্পন্ন মানুষ এক সুন্দর প্রভাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে যদি আঙ্গুল দিয়ে গুনতে শুরু করে, কী কী জিনিস তার জীবনে অধিক আনন্দ দান করে; তাহলে সে দেখতে পাবে তার তালিকায় প্রথম স্থানটি দখল করে আছে খাবার”। 


বাংলাদেশের প্রতিটা জেলারই স্পেশাল খাবার নিয়ে কোন না কোন ঐতিহ্য আছে। যে ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরে সে জেলারই কৃষ্টি এবং কালচারকে। টাংগাইলের চমচম, বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, রাজশাহীর আম এমনই অনেক কিছু। তেমনিভাবে জামালপুর জেলারও বিখ্যাত একটি খাবার রয়েছে। যাকে পিঠালি বলা হয়। এটা ঘটা করে প্রতিদিনের খাবার নয়। এটা কেবল বিশেষ কোন বড় অনুষ্ঠাণের ক্ষেত্রে পরিবেশন করা হয়।


বাংলাদেশের অনেক জেলার মানুষ এ খাবারটির সাথে পরিচিত না থাকলেও- এটা জামালপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবার অনেকটা হালিমের মত। তবে হালিম নয়, নানান মশলা এবং উপকরণের বৈচিত্র্যতায় যা স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। যা শত বছর ধরে জামালপুর জেলার ঐতিহ্যকে বহন করে আসছে।


নিঃসন্দেহে পিঠালি জামালপুর জেলার সবচেয়ে সুস্বাদু আর জনপ্রিয় খাবারের একটি। কারও মৃত্যু বা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেকে আবার এটাকে ম্যান্দা বা মিলানি নামেও ডাকেন। তবে, যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এ খাবার জামালপুরবাসীর প্রিয়। খেলেই শুধু বোঝা যায়, কেন এই পিঠালির নাম শুনলে জিবে পানি চলে আসে।


বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এই এলাকার মানুষও ভাত, সবজি, মাছ, ডালে অভ্যস্ত। কিন্তু এই পিঠালি যখন রান্না হয় কারও বাড়িতে, তখন যেন উৎসব লেগে যায়। মূলত বড় কোনো উপলক্ষে পিঠালি রান্না হলেও এই অঞ্চলে উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতেও পিঠালির প্রচলন রয়েছে। 



ঠিক কখন থেকে জামালপুরবাসী পিঠালির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে, তার সুস্পষ্ট কোনো ইতিহাস জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, শত বছরের বেশি সময় ধরে জামালপুরবাসী পিঠালির ঐতিহ্য লালন করছে। স্বাধীনতার আগেও নাকি বিচার-সালিস বৈঠকে ও বিয়ের অনুষ্ঠানে পিঠালি পরিবেশন করা হতো। সেই ধারাবাহিকতা সেভাবে না থাকলেও এখনো পিঠালির প্রচলন রয়েছে। 


কারও মৃত্যু হলে ৪০ দিনের দিন যে দোয়া বা মিলাদের আয়োজন করা হয়, তাকে জামালপুর জেলায় ‘চল্লিশা’ বা ‘বেপার’ বলে। এই বেপারে সব শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে বসে কলাপাতায় ভাতের সঙ্গে গরম গরম পিঠালি খান। প্লেট নয়, কলাপাতায় সার বেঁধে পিঠালি খাওয়াও এখানকার একটি বহমান ঐতিহ্য। এছাড়াও এলাকার মুসলমানেরা বিয়ে, আকিকা, খতনাসহ নানা উৎসবে পিঠালির আয়োজন করে। এখানকার প্রতিটা বাড়িতে বাড়িতে সবাই যেমন পিঠালি রান্না করতে পছন্দ করে, তেমনি খেতেও পছন্দ করে।


পিঠালি তৈরিতে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় গরু, খাসি অথবা মহিষের মাংস। সেই সাথে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরাসহ নানা প্রকার মসলা। সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিস যা ছাড়া পিঠালি তৈরি অসম্ভব তা হচ্ছে- চালের গুঁড়া। এই চালের গুঁড়া খাবারটাকে ঘন করে, অন্য রকম স্বাদ দেয়। তবে পিঠালি তৈরির প্রায় শেষের দিকে যে রসুন, পেঁয়াজ আর জিরা দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাগাড়টা দেওয়া হয়, তাতেই কিন্তু পূর্ণ স্বাদটা চলে আসে।


সুত্রঃপ্রথমআলো


লেখকঃ এম, আর, খান সুমন